পিএনএস ডেস্ক: আটলান্টার ফুটবল মাঠে তখনো চলছিল বিজয় উৎসব। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়েছে আর্জেন্টিনা। টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে ওঠার আনন্দে ভাসছিল লিওনেল মেসির দেশ। কিন্তু মাঠের সেই জয়োচ্ছ্বাসের রেশ কাটতে না কাটতেই শুরু হলো নতুন উত্তেজনা।
এবার ফুটবল মাঠের লড়াই রূপ নিয়েছে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক যুদ্ধে। আর্জেন্টিনার জলসীমায় অবৈধভাবে ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ প্রবেশের অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে দশকের পুরোনো ফকল্যান্ড বিরোধ আবার নতুন করে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাজ্যের নৌবাহিনীর একটি যুদ্ধজাহাজকে কেন্দ্র করে এই সংকটের সূত্রপাত। আর্জেন্টিনা সরকারের দাবি, তাদের অনুমতি ছাড়াই ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজটি জলসীমায় প্রবেশ করেছে। একে সরাসরি ‘সামরিক আগ্রাসন’ বলে আখ্যা দিয়েছে বুয়েনস আইরেস।
তবে এই অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে যুক্তরাজ্য। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনেই এই জাহাজটি চলাচল করছিল এবং বিষয়টি আগে থেকেই আর্জেন্টিনাকে জানানো হয়েছিল।
আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের ফুটবল ম্যাচ মানেই ফুটবল ভক্তদের জন্য বাড়তি এক উত্তেজনা। ১৯৮৬ সালের দিয়েগো ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত ম্যাচের স্মৃতি এখনো সবার মনে তাজা। এবারের সেমিফাইনাল ম্যাচটিও ছিল ঠিক তেমনই টানটান উত্তেজনায় ঠাসা। ২-১ ব্যবধানে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে মাঠেই উদযাপনে মেতে ওঠেন আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা। তবে তাদের এই উদযাপন সাধারণ কোনো জয়োৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।
ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়েরা মাঠের মধ্যে একটি বড় ব্যানার প্রদর্শন করেন। সেই ব্যানারে স্পষ্ট ভাষায় লেখা ছিল, ‘লাস মালভিনাস সন আর্জেন্টিনাস’। এর অর্থ হলো, ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ আর্জেন্টিনার।
এই ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে কয়েক দশকের পুরোনো রাজনৈতিক বিরোধ রয়েছে।
আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়দের এই ব্যানার প্রদর্শন লন্ডনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। যুক্তরাজ্যের ব্যবসায় বিষয়ক মন্ত্রী পিটার কাইল এই ঘটনার তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি একে সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত এবং নিয়মবহির্ভূত বলে বর্ণনা করেছেন। ফুটবল মাঠ থেকে রাজনীতিকে সবসময় দূরে রাখা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ ধরনের রাজনৈতিক বার্তা বিশ্ব ফুটবলের নিয়মের পরিপন্থি কি না, তা খতিয়ে দেখতে তিনি ফিফার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, এই ব্যানার প্রদর্শনের তীব্র সমর্থন জানিয়েছেন আর্জেন্টিনার ভাইস প্রেসিডেন্ট ভিক্টোরিয়া ভিলারুয়েল। ম্যাচ শুরুর আগেই তিনি ইংল্যান্ডকে ‘দখলদার’ ও ‘জলদস্যু’ বলে আক্রমণ করেছিলেন। ম্যাচ শেষে খেলোয়াড়দের সেই ব্যানার ধরা ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেন তিনি। সেখানে তিনি অত্যন্ত আবেগী এক বার্তা লিখেছেন। তিনি বলেন, ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ সব সময়ই আর্জেন্টিনারই থাকবে।
জলসীমায় যুদ্ধজাহাজ
ফুটবল মাঠের এই উত্তেজনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সমুদ্র সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়। আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাবলো কিরনো অভিযোগ করেন, ব্রিটিশ রয়্যাল নেভির টহল জাহাজ ‘এইচএমএস মেডওয়ে’ আর্জেন্টিনার জলসীমায় বেআইনিভাবে প্রবেশ করেছে। তাদের দেশের সরকার বা নৌবাহিনীকে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য না দিয়েই এই জাহাজটি চালানো হয়েছে। একে তিনি আর্জেন্টিনার জলসীমায় একটি স্পষ্ট ‘সামরিক অনুপ্রবেশ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
এই ঘটনার পর আর্জেন্টিনা কূটনৈতিকভাবে কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তাৎক্ষণিকভাবে ব্রিটিশ সরকারের কাছে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। ব্রিটিশ দূতাবাসে একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদপত্র পাঠিয়েছে আর্জেন্টিনা সরকার। সেখানে এই নিয়ম লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি জানানো হয়েছে। আর্জেন্টিনার দাবি, এটি তাদের দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত। কোনো ধরনের পূর্ব ঘোষণা ছাড়া এভাবে যুদ্ধজাহাজ পাঠানো অত্যন্ত উসকানিমূলক কাজ।
‘এইচএমএস মেডওয়ে’ হলো রিভার-ক্লাসের একটি অত্যন্ত আধুনিক অফশোর টহল জাহাজ। সাধারণত দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জেই এই জাহাজটিকে মোতায়েন রাখা হয়। ফলে এই জাহাজের সামান্যতম চলাচল আর্জেন্টিনার জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়।
অভিযোগ উড়িয়ে দিলো যুক্তরাজ্য
আর্জেন্টিনার এই গুরুতর অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে যুক্তরাজ্য। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর থেকে এ বিষয়ে একটি স্পষ্ট বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, এইচএমএস মেডওয়ের এই যাত্রার বিষয়ে আর্জেন্টিনাকে আগেভাগেই জানানো হয়েছিল। এটি কোনো আকস্মিক বা গোপন অনুপ্রবেশ ছিল না। এটি ছিল অত্যন্ত সাধারণ এবং স্বাভাবিক একটি রুটিন কার্যক্রম।
ডাউনিং স্ট্রিটের মুখপাত্র জানিয়েছেন, চিলিতে একটি সাধারণ লজিস্টিক সফরের অংশ হিসেবে জাহাজটি চলাচল করছিল। ব্রিটিশ অ্যান্টার্কটিক সার্ভের বৈজ্ঞানিক গবেষণা কার্যক্রমকে সহায়তা দিতে প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহের উদ্দেশ্যে এই রুটিন সফরটি করা হয়। আর এই যাত্রার বিষয়ে নিয়ম অনুযায়ী আর্জেন্টিনার সরকারকে আগেভাগেই অবহিত করা হয়েছিল। ফলে এখানে কোনো আন্তর্জাতিক আইন বা নিয়ম লঙ্ঘন করা হয়নি।
আর্জেন্টাইন ফুটবলারদের ব্যানার প্রদর্শন এবং ফকল্যান্ডের মালিকানার দাবি নিয়েও মুখ খুলেছে যুক্তরাজ্য। ডাউনিং স্ট্রিট তাদের পুরোনো অবস্থান পুনরুল্লেখ করে জানিয়েছে, ফকল্যান্ডের বাসিন্দারা বারবার যুক্তরাজ্যের সঙ্গে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তাদের নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার বা আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার রয়েছে। ফকল্যান্ডের জনগণ ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবেই থাকতে চান এবং তাদের এই অধিকার সবার ওপরে।
ইতিহাসের ক্ষত
আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের মধ্যকার ফকল্যান্ড বিরোধের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী। আর্জেন্টিনা মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ৩০০ মাইল দূরে এই দ্বীপপুঞ্জটি অবস্থিত। অন্যদিকে যুক্তরাজ্য থেকে এর দূরত্ব প্রায় আট হাজার মাইল। ১৮৩৩ সাল থেকে দ্বীপপুঞ্জটি যুক্তরাজ্যের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কিন্তু আর্জেন্টিনা বরাবরই এই দ্বীপপুঞ্জটিকে নিজেদের দাবি করে আসছে। তাদের ভাষায় এর নাম ‘মালভিনাস’।
১৯৮২ সালে এই বিরোধের জেরে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। তৎকালীন আর্জেন্টিনা সরকার দ্বীপে সেনা পাঠালে যুক্তরাজ্য সামরিক শক্তি দিয়ে তা প্রতিহত করে। ৭৪ দিনের সেই যুদ্ধে কয়েকশ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। যুদ্ধে আর্জেন্টিনার পরাজয় ঘটলেও তারা ফকল্যান্ডের দাবি কখনো ছেড়ে দেয়নি। প্রতিবছরই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে তারা এই দাবি তুলে ধরে। সূত্র: নিউইয়র্ক পোস্ট, দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট, ইন্ডিয়া টুডে
পিএনএস/রাআ
বিশ্বকাপে হার: আর্জেন্টিনার জলসীমায় ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ অনুপ্রবেশের অভিযোগ
17-07-2026 02:21AM

