সারা দেশে ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন শুরু আজ, পাবে ২ কোটি ৩৫ লাখ শিশু

  28-06-2026 10:31AM


পিএনএস ডেস্ক: আজ থেকে সারা দেশে আবারও শুরু হচ্ছে জাতীয় ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন। একদিন ব্যাপী এই ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে ৬৪ জেলার প্রায় আড়াই কোটি শিশু ভিটামিন এ পাবে। ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদেরকে ভিটামিন ‘এ’ এর ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে।

রোববার (২৮ জুন) সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত সারাদেশে একযোগে ক্যাম্পেইনটি অনুষ্ঠিত হবে।

জানা গেছে, শিশুদের অন্ধত্ব ও পুষ্টিহীনতা দূর করতে ১৯৭৩ সাল থেকে দেশে ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়নো শুরু হয়। এটি তখন ‘জাতীয় রাতকানা রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রম’ নামে পরিচিত ছিল। ১৯৯৫ সাল থেকে কার্যক্রমটিকে আরও শক্তিশালী করার জন্য জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির সাথে ভিটামিন এ কে সংযুক্ত করা হয়।

পরবর্তীতে ২০০৩ সাল থেকে এটিকে আলাদা একটি কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ করা হয় যার নাম দেওয়া হয় জাতীয় ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন, যা জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হতো। ২০১১ সাল থেকে স্বাস্থ্য অধিদফতরের জাতীয় পুষ্টিসেবা বা এনএনএস অপারেশন প্ল্যানের অধীনে ২০২৫ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত পরিচালিত হয়ে আসছিলো এবং পরে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ২০২৬ সালে কার্যক্রম হিসেবে পুনরায় চালু করা হয়েছে।

ক্যাম্পেইন বাস্তবায়নের দায়িত্বে আছে জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এবারের ক্যাম্পেইনে ২ কোটি ৩৫ লাখ ১৪ হাজার ৯৭২টি শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬ মাস থেকে ১১ মাস বয়সী শিশুদের সংখ্যা (যাদের নীল রঙের ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে) ২৮ লাখ ৩৮ হাজার ৭৯৪ জন। ১২ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের সংখ্যা (যাদের লাল রঙের ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে) ২ কোটি ৫ লাখ ৭৬ হাজার ১৭৮ জন।

নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিবছর দুবার ভিটামিন এ ক্যাপসুলের ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা। তবে ক্যাপসুল সংকটে গত বছরের মার্চ মাসের পর থেকে তা আর হয়নি। দীর্ঘ ১৪ মাস বন্ধ ছিল এই ক্যাম্পেইন। দীর্ঘ সময় পর ২৮ জুন এই ক্যাম্পেইন হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, শিশুদের অন্ধত্ব, অপুষ্টি এবং বিভিন্ন সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে ভিটামিন ‘এ’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু রাতকানা রোগ প্রতিরোধই করে না, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি জেরোফথ্যালমিয়া, দীর্ঘমেয়াদি ডায়রিয়া, হামসহ বিভিন্ন সংক্রমণজনিত রোগের ঝুঁকি কমাতেও সহায়তা করে। এ কারণে বছরে দুইবার, ছয় মাস অন্তর জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন পরিচালনার কথা বলা হয়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সারাদেশে এই ক্যাম্পেইন সফল করার জন্য ফিক্সড আউট বিচ কেন্দ্র থাকবে ১ লক্ষ ২০ হাজার। এছাড়া লঞ্চঘাট, ফেরীঘাট, ট্রেইনট্রেশন, বাসস্টেশন ইত্যাদিতে মোবাইল কেন্দ্র থাকবে ৫০০টি। এছাড়া দুর্গম অঞ্চলে ১২ টি জেলার ৫৮ টি উপজেলার ১৯০টি ইউনিয়নের ৭১৪টি ওয়ার্ডে ক্যাম্পেইন পরবর্তী ৪ দিন চাইল্ড টু চাইল্ড সার্চিং কার্যক্রম চালানোর মাধ্যমে শিশুদেরকে ভিটামিন এ খাওয়া হবে।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ভিটামিন এ ক্যাপসুল ক্যাম্পেইন আমরা আবার হাতে নিয়েছি। ক্যাম্পেইনটি সফল করতে সবাইকে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছি।

ক্যাম্পেইনের দিন পরিবারের ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী সব শিশুকে কাছের কেন্দ্রে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে নিয়ে গিয়ে ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো নিশ্চিত করতে অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এমএ মুহিত বলেন, রাতকানা রোগ থেকে শুরু করে শিশু অন্ধের একটা প্রধান কারণ হচ্ছে ভিটামিন এ-র অভাব। বাংলাদেশে দুই দশক আগে সারাদেশের যেকোনো জায়গায় দেখতে পেতাম অপুষ্টিজনিত কারণে শিশুরা অন্ধ হয়ে যেত। ভিটামিন এ ক্যাপসুলের বিতরণ চালু হওয়ার পর এটা অত্যন্ত দ্রুত কমে এসেছে। আজকাল আমরা খুব কমই ভিটামিনের অভাবজনিত কারণে অন্ধত্ব বরণ করা শিশু দেখতে পাই।

তিনি বলেন, এই ক্যাপসুল ক্রয় করা হয়েছে ইউনিসেফ থেকে। নীল রঙের ক্যাপসুল ৪০ লক্ষ পিস এবং লাল রঙের ক্যাপসুল নেওয়া হয়েছে ২ কোটি ২০ লক্ষ পিস। ২৬ জুন সারাদেশের ক্যাপসুল বিতরণ কেন্দ্রে পৌঁছানো হয়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সিভিল সার্জন এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তারা (নিজেদের টিমের মাধ্যমে) স্থানীয় পর্যায়ে মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ে তদারকির কাজ সম্পন্ন করতে মন্ত্রণালয় নির্দেশ দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তীব্র বা জটিল অসুস্থতা ছাড়া প্রায় সব শিশুই এ ক্যাপসুল গ্রহণ করতে পারবে। ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানোর সময় শিশুদের ভরা পেটে আনতে হবে। ভিটামিন এ ক্যাপসুল কেটে তা চিপে শিশুদের খাওয়ানো হবে। জোর করে বা কান্নারত অবস্থায় ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো যাবে না। ছয় মাসের কম বয়সী ও পাঁচ বছরের বেশি বয়সী এবং অসুস্থ শিশুকে ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো যাবে না।

তাদের মতে, জন্মের পরপরই নবজাতককে শালদুধসহ মায়ের দুধ খাওয়ানো শুরু করুন। জন্মের পর প্রথম ৬ ছয় মাস (১৮০) শুধুমাত্র মায়ের দুধ খাওয়ান। পানি, মধু, চিনি ও মিসরির পানি ইত্যাদি খাওয়ানো যাবে না। শিশুর বয়স ৬ মাস পূর্ণ হলে মায়ের দুধের পাশাপাশি পরিমান মতো ঘরে তৈরি সুষম খাবার খাওয়ান।

৬-১১ মাস বয়সী শিশুকে ১টি নীল রঙের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ান। ১২-৫৯ মাস বয়সী শিশুকে বছরে দু’বার ১টি করে লাল রঙের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ান। মা ও শিশুর পুষ্টি নিশ্চিতকরণে গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েদের স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পরিমাণে ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ প্রাণিজ খাবার (মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, কলিজা) ও উদ্ভিজ খাবার (হলুদ ফলমূল ও রঙিন শাক-সবজি) খেতে দিন।

জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য পুষ্ঠি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ ইউনুস আলী অবলেন, আমাদের সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। ক্যাম্পেইন বাস্তবায়নের জন্য আমরা সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছি। শিশুদের অভিভাবকেরা কাছাকাছি কেন্দ্রগুলোয় গিয়ে তাদের সন্তানদের ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়াতে পারবেন। শিশুরা সারাদেশে রোববার (২৮ জুন) সকাল আটটা থেকে ভিটামিন এ ক্যাপসুল খেতে পারবে।

তিনি বলেন, কর্মসূচি সফল করার জন্য নানাভাবে প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়েছে। সবার সার্বিক সহযোগিতা চাই। ভিটামিন এ খেলে শিশুরাই উপকৃত হবে এবং তাদের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে। সেইসঙ্গে নানা রোগ ব্যাধি থেকে সুরক্ষা পাবে শিশুরা।



পিএনএস/এমএইউ

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন