জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ‘বাংলাদেশের মন’: প্রধানমন্ত্রী

  02-07-2026 03:29PM

পিএনএস ডেস্ক: জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে ‘বাংলাদেশের মন’ হিসেবে বিবেচনা করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, এই বাংলাদেশ ভূখণ্ডে জন্মগ্রহণ না করলেও তার হৃদয়জুড়ে ছিল বাংলাদেশ। বাংলাদেশও তাকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসে।

‘নজরুল বর্ষ ২০২৬-২৭’-এর বছরব্যাপী কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনকালে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

২০২৬ সালের ২৫ মে থেকে ২০২৭ সালের ২৫ মে পর্যন্ত সময়কে সরকার ‘নজরুল বর্ষ’ ঘোষণা করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জাতীয় কবি শুধু অতীতের নন, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও সমান প্রাসঙ্গিক। তাই তার জীবন, কর্ম ও দর্শন ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হবে।

বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সকালে বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষ থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সারাদেশে একযোগে ‘নজরুল বর্ষ ২০২৬-২৭’-এর বছরব্যাপী কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিন দিনব্যাপী উদ্বোধনী আয়োজন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী স্মারক ডাকটিকিট এবং ‘নজরুল বর্ষ ২০২৬-২৭’-এর লোগো উন্মোচন করেন।

সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার এবং সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা। অনুষ্ঠানে দেশের নজরুল গবেষক, সংস্কৃতিকর্মী ও শিল্পীরাও অংশ নেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, কিশোর বয়সে ১৯১৪ সালে নজরুল প্রথমবারের মতো ময়মনসিংহের ত্রিশালে এসেছিলেন। সেই স্মৃতিবিজড়িত ত্রিশালকে ‘নজরুল সিটি’ ঘোষণার সম্ভাব্যতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তিনি বলেন, বিদ্রোহী কবি, প্রেমের কবি, বিরহের কবি, তারুণ্যের কবি এবং বাংলাদেশের ঐতিহ্যের কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের জাতীয় সাহিত্য-সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অবিস্মরণীয় নাম। পরাধীন, পর্যুদস্ত ও পরাভূত জাতির ভাগ্যাকাশে তার আবির্ভাব ছিল আলোকবর্তিকার মতো। পরাধীনতা, জুলুম, নির্যাতন, শোষণ, অসাম্য, বৈষম্য, কুসংস্কার এবং সব ধরনের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে কবির কলম ছিল শানিত অস্ত্র। বিপ্লব-বিদ্রোহ, রণসংগীত, ইসলামী তাহজিব-তমদ্দুন, ইসলামি মূল্যবোধ, ভজন-কীর্তন, শ্যামা সংগীত, প্রেম, প্রকৃতি, মানবিক মূল্যবোধ কিংবা কৈশোর ও যৌবনের অনুভূতি-সব ক্ষেত্রেই নজরুল আমাদের শুদ্ধ প্রকাশ।

তিনি বলেন, মাতৃভূমিকে ভালোবাসার ক্ষেত্রেও নজরুল আমাদের অন্যতম প্রধান দিশারী। আমাদের জীবন, আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন, সংগ্রাম, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য তার রচনায় মহিমাময় সৌন্দর্যে প্রকাশিত হয়েছে। অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রেরণা তিনি আজও দিয়ে চলেছেন। তার প্রাসঙ্গিকতা কখনো ফুরাবে না।

মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে দেশের সব আন্দোলন-সংগ্রামে নজরুলের কবিতা ও গান ছিল অনুপ্রেরণার উৎস। এমনটি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান প্রজন্মের সঙ্গে জাতীয় কবির সম্পর্ক আরও গভীর ও নিবিড় করতেই নানা আয়োজনে ‘নজরুল বর্ষ’ শুরু হয়েছে।

তবে, উদ্বোধনী আয়োজনের ধরন নিয়েও নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন সরকারপ্রধান। তিনি বলেন, একটি আধুনিক আবদ্ধ ঘরে বসে বছরব্যাপী কর্মসূচির উদ্বোধন, স্মারক ডাকটিকিট ও লোগো উন্মোচনের পরিবর্তে অনুষ্ঠানটি আরও জনসম্পৃক্ত হতে পারতো।

আমন্ত্রণপত্রে ‘সকল বিভাগীয় কমিশনার, জেলা এবং নির্বাচিত ৭৪টি উপজেলার উপজেলা নির্বাহী অফিসারগণ ভার্চুয়ালি সংযুক্ত থাকবেন’ উল্লেখ থাকার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এর পরিবর্তে যদি বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নজরুল গবেষক, নজরুল শিল্পী এবং নজরুলপ্রেমীদের ভার্চুয়ালি সংযুক্ত থাকার কথা উল্লেখ থাকতো, তবে সেটি অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্যের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ হতো।

তিনি বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কিংবা ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণ অনুষ্ঠানে যেমন নজরুল গবেষক বা শিল্পীদের ভার্চুয়ালি সংযুক্ত থাকার কথা বলা অযৌক্তিক মনে হয়, তেমনি ‘নজরুল বর্ষ’ উদযাপনে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ভার্চুয়াল সংযুক্তিকেও একই কারণে উদ্দেশ্যের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয় না।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি রাষ্ট্র ও সমাজে এমন কিছু ক্ষণজন্মা মানুষ জন্ম নেন, যারা সমাজ, রাষ্ট্র, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মানুষের মনোজগতে গভীর প্রভাব রেখে যান। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তেমনই একজন ব্যক্তিত্ব।

তিনি বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ইতিবাচক-নেতিবাচক প্রভাবের এই সময়ে মূল্যবোধসম্পন্ন সাহিত্য নতুন প্রজন্মের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ। নজরুলের ‘আমি হবো সকাল বেলার পাখি’ কিংবা ‘থাকবো নাকো বদ্ধ ঘরে’-এ ধরনের কবিতা ও ছড়া নতুন প্রজন্মের জন্য আশা জাগানিয়া আলোকবর্তিকা হতে পারে।

সরকারপ্রধান বলেন, কবি নজরুলকে নিয়ে আলোচনা মন্ত্রণালয় কিংবা সরকারি অফিসের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ না রেখে তার সাহিত্য, জীবনবোধ, চিন্তা ও দর্শন মানুষের ঘরে ঘরে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দিতে হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি নজরুলের ‘অভয়-সুন্দর’ কবিতা থেকে উদ্ধৃতি দেন।

তিনি বলেন, বছরব্যাপী সাহিত্য সম্মেলন, গবেষণা, সেমিনার, সাংস্কৃতিক উৎসব, নজরুল সংগীতের আসর, প্রকাশনা, নাট্যোৎসব ও চিত্র প্রদর্শনীর মাধ্যমে জাতীয় কবির সৃষ্টিকে জনপরিসরে আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। একইসঙ্গে ডিজিটাল মাধ্যমে তার সাহিত্য ও সংগীত সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রচারেরও সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি সারাদেশে নজরুল বিশেষজ্ঞ ও নজরুলপ্রেমীদের নিয়ে ‘নজরুল বর্ষ উদযাপন জাতীয় কমিটি’ গঠনের মাধ্যমে জেলা, উপজেলা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করে বছরব্যাপী কর্মসূচি বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে, এর মাধ্যমে বাংলাদেশের পাশাপাশি বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক গবেষক সমাজের কাছেও নজরুলের সাহিত্যকর্ম আরও বিস্তৃতভাবে পৌঁছে যাবে।

নিজের মূল্যায়নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেকেই নজরুলকে নানা বিশেষণে অভিহিত করেন। তবে একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে তাঁর কাছে কাজী নজরুল ইসলাম হলেন ‘বাংলাদেশের মন’।

তিনি নজরুলের ‘গাহি সাম্যের গান’ কবিতা উদ্ধৃত করে বলেন, বিভেদ সৃষ্টির অপচেষ্টা থাকলেও মিলেমিশে থাকাই বাংলাদেশের মানুষের চিরায়ত মূল্যবোধ। বর্তমান সরকারও এমন একটি রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ে তুলতে কাজ করছে, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ নিরাপদে বসবাস করবে। শুধু মানুষের নয়, কোনো প্রাণীও যেন মানুষের হিংস্রতার শিকার না হয়, সরকার সেটিও নিশ্চিত করতে চায়।

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে জাতীয় কবির জীবন, কর্ম, সাহিত্য, সংগীত, দর্শন ও মানবিক চেতনাবোধের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী ‘নজরুল বর্ষ ২০২৬-২৭’-এর বছরব্যাপী কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই আয়োজনের মাধ্যমে দেশে-বিদেশে জাতীয় কবির সৃষ্টিকর্ম নতুনভাবে মূল্যায়িত হবে।


পিএনএস/মোআ

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন