এশিয়া ও ইউরোপে যাচ্ছে দেশের কাঁকড়া -রপ্তানি করে বিপুল পরিমান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব

  15-12-2014 05:10PM

পিএনএস রিপোর্ট : কোন কিছুই ফেলনা নয়। বৈচিত্র্যময় ভোজন বিলাসীদের জন্য সুস্বাদু, মুখরোচক ও উপাদেয় এক খাবারের নাম বাংলার কাঁকড়া। অপার সম্ভাবনাময় আমাদের এ দেশ। দেশের আনাচে-কানাচে অনাবিষ্কৃত-অপ্রচলিত অনেক সম্পদ অযত্নে-অবহেলায় পড়ে আছে। অথচ সে গুলির প্রতি একটু যত্নবান হলেই দেশ এগিয়ে যাবে বহুলাংশে। বিপুল পরিমান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করাও সম্ভব হবে। এমনি একটি সম্পদ হচ্ছে কাঁকড়া।

বাংলাদেশের নদি-নালা, খাল-বিল এবং বিভিন্ন জলাশয়ে প্রচুর পরিমানে কাঁকড়া পাওয়া যায়। অনেকেই উপাদেয় খাবার হিসাবে কাঁকড়া ভক্ষন করে থাকে। মুসলিম প্রধান বাংলাদেশে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনায় মকরুহ মনে করে অনেকে খায়, আবার অধিকাংশ মানুষই খায় না। কিন্তু বিদেশীরা বিশেষ করে, ইউরোপ, পশ্চিমা বিশ্ব, থাইল্যান্ড প্রভৃতি দেশের অধিবাশীরা কাঁকড়া খেয়ে থাকে।

মুলতঃ কাঁকড়া আক্ষরিক অর্থেই চিংড়ি প্রজাতির। কাজেই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে রপ্তানিযোগ্য মৎস্য পণ্যের মধ্যে চিংড়ির পরেই কাঁকড়ার অবস্থান। প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণে কাঁকড়া হংকং, মালয়েশিয়া, তাইওয়ান, সিংগাপুরসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ এবং ইউরোপ মহাদেশে রপ্তানি হচ্ছে। যার সিংহভাগই উপকূলীয় অঞ্চলের বিশেষ করে খুলনার পাইকগাছা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, পটুয়াখালী ইত্যাদি অঞ্চলের প্রাকৃতিক লোনাপানি জলাশয় হতে আহরিত হয়ে থাকে।



বর্তমানে সারাদেশে আড়াই থেকে তিন লক্ষ লোক কাঁকড়া আহরণ ও বিপনন করে জীবিকা নির্বাহ করছে। প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে প্রতিনিয়ত কাঁকড়া আহরণের ফলে প্রকৃতিতে এর প্রাচুর্যতা দিনে দিনে হ্রাস পাচ্ছে। প্রকৃতি হতে আহরণকৃত কাঁকড়ার মধ্য হতে রপ্তানিযোগ্য কাঁকড়া বাছাই প্রক্রিয়ায়ও বেশ পরিমাণে কাঁকড়া বিনষ্ট হয়। নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে কাঁকড়া চাষ ও রপ্তানিযোগ্য কাঁকড়া উৎপাদনে ফ্যাটেনিং কার্যক্রম গ্রহণ করা হলে উৎপাদন ও আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি আহরণ ও বাছাইকালে এর অপচয় রোধ করা সম্ভব হবে এবং অন্যদিকে প্রকৃতি হতে কাঁকড়ার আহরণ চাপ হ্রাস পেয়ে জীববৈচিত্র সংরক্ষিত হবে। চাষ উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রাকৃতিক উৎস হতে আহরিত অপরিপক্ক ও কম মূল্যের কাঁকড়া ফ্যাটেনিং এর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে এবং উপকূলীয় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দারিদ্র বিমোচনসহ জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন হবে। বিভিন্ন কাঁকড়া চাষীদের মতামতের ভিত্তিতে এবং গবেষকদের বিশ্লেষণ মোতাবেক ফ্যাটেনিং এর উপর ধারণা বর্ণনা করা হলো-প্রথমত ঘের নির্বাচন ও প্রস্তুতি, কাঁকড়া ফ্যাটেনিং এর জন্য দো-আঁশ বা পলিযুক্ত দো-আঁশ মাটি সবচেয়ে ভালো। ঘেরের আয়তন ০.৫-০.১ হেক্টর ও পানির গভীরতা ১.০-১.৫ মিটার, পানির লবনাক্ততা ৫-২৫ পিপিটি, তাপমাত্রা ২০-৩০ ডিগ্রী সে, দ্রভিভুত অক্সিজেন ৪-৮ পিপিএম এবং পি.এইচ ৭.৫-৮.৫ এর মধ্যে থাকলে ভালো ফল আশা করা যায়। ঘের শুকানোর পর পাড় ভালোভাবে সংস্কার এবং কাঁকড়া যাতে বের হয়ে যেতে না পারে তার জন্য ১.৫ মিটার উচ্চতার বাঁশের বানা/বেড়া দিয়ে পুকরের চারপাশ ঘিরে দিতে হবে এবং কাঁকড়া মাটি গর্ত করে যাতে না পালাতে পারে তার জন্য বানার ০.৫ মিটার মাটির নিচে পুঁতে দিতে হবে। এর পর পুকুরে প্রতি শতকে ১ কেজি হারে পাথুরে চুন প্রয়োগ করতে হবে। চুন প্রয়োগের ৭ দিন পর পুকুরে ০.২৫ মিলি মিটার ছিদ্রযুক্ত নাইলন জাল দিয়ে ছেকে জোয়ারের পানি তুলতে হবে এবং প্রতি শতকে ২ কেজি সরিষার খৈল, ১০০ গ্রাম টিএসপি এবং ৮০ গ্রাম ইউরিয়া সার প্রয়োগ করতে হবে। দ্বিতীয়ত-কাঁকড়া মজুদ পানিতে জৈব ও অজৈব সার প্রয়োগের ৪-৫ দিন পরপানির রং সবুজাভ হলে পুকুরে কাঁকড়া মজুদ করা যাবে। গোনাড (ডিম্বাশয়) অপরিপক্ক সুস্থ-সবল ও সকল পাসহ স্ত্রী কাঁকড়া (১৭৫ গ্রাম বা তদুর্ধ) নাইলন ফিতা দিয়ে ভালো ভাবে বেঁধে পুকুরে প্রতি শতকে ২৫০-৩০০ টি মজুদ করতে হবে। তৃতীয়ত-খাদ্য প্রয়োগ ও পরিচর্যা খাবার হিসাবে ছোট তেলাপিয়া মাছ, শামুক-ঝিনুকের মাংস, ছোট চিংড়ি ও চিংড়ির মাথা, কুইচ্ছা, ইত্যাদি ছোট ছোট টুকরা করে কাঁকড়ার শরীরের ওজনের ৮-৫% হারে দৈনিক সকাল ও বিকালে ২ বার পুকুরে দিতে হবে। মাঝে মাঝে পুকুরে নেমে অথবা খাদ ট্রেতে খাবার দিয়ে খাদ্য গ্রহণের প্রবণতা পর্যবেক্ষণপূর্বক খাবার সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পানি যাতে নষ্ট না হয় তার জন্য অমাবস্যা বা পূর্ণিমার ভরা জোয়ারের সময় ৪-৭ দিন ৩০-৪০% হারে পুকুরের পানি পরিবর্তন করতে হবে।



এভাবে নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে ১৪-১৬ দিনের মধ্যে কাঁকড়ার গোনড পরিপক্ক হয়ে যায় ও বিদেশে রপ্তানিযোগ্য বিক্রির উপযুক্ত কাঁকড়ায় পরিণত হয়। চতুর্থ-আয়-ব্যয় সংক্রান্ত বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে উপকূলীয় এলাকায় প্রাকৃতিকভাবে ছয় মাস (ফেব্রুয়ারী-জুলাই) যে লবনাক্ততা পাওয়া যায়, তাতে এক বছরে প্রতি মাসে ২ টি ব্যাচ হিসাবে ১২ টি ব্যাচে কাঁকড়া ফ্যাটেনিং করা সম্ভব। নিম্নে ১০ শতক পুকুরের কাঁকড়া ফ্যাটেনিং এর ১ বছরের আয়-ব্যয় এর হিসাব দেওয়া হল-নিদিষ্ট ব্যয়-বাঁশের বানা ৬৮০০ টাকা, বানা স্থাপনের জন্য বাঁশ ১০০০ টাকা, ব্লু-নেট ও নাইলন ফিতা ১০০০ টাকা, পুকুর লিজ ৩,০০০ টাকা। মোট নিদিষ্ট ব্যয় ১১,৮০০ টাকা, অনিদিষ্ট ব্যয় চুন ১৫০ টাকা, সরিষার খৈল ৬৪০ টাকা, টিএসপি ২৪ টাকা, ইউরিয়া ১২ টাকা, অপরিপক্ক স্ত্রী কাঁকড়া (গড় ওজন ১৮০ গ্রাম) ৩,০০০ টি প্রতি কেজি ৩০০ টাকা ক্রয় মূল্য হিসাবে খরচ ১৬২,০০০ টাকা, খাদ্য (গড়ে ৮% হারে তেলাপিয়া/ট্রাশ ফিস ১৫ দিনের জন্য) ৬৪৮ কেজি ৪০ টাকা দরে খরচ ২৫,৯২০, শ্রমিকের মুজুরি ২,৫০০ টাকা এবং অন্যান্য খরচ ১,০০০ টাকা। মোট অনিদিষ্ট ব্যয় ১৯২,২৪৬, মোট ব্যয় ১১,৮০০ + ১৯২,২৪৬= ২০৪,০৪৬, আয় ধরার সময় পরিপক্ক স্ত্রী কাঁকড়ার গড় ওজন হবে ১৯০ গ্রাম, বাঁচার হার ৯০% এবং বিক্রয় মূল্য ৫০০ টাকা হিসাবে মোট আয় ২৫৬,৫০০ টাকা, ১ বছরে ১২ ব্যাচে মোট আয় ২৫৬,৫০০ দ্ধ ১২= ৩,০৭৮,০০০ টাকা, ১ বছরে ১২ ব্যাচে মোট ব্যয় ২০৪,০৪৬ + (১৯২,২৪৬ দ্ধ ১১) সমান ২,৩১৮,৭৫২ টাকা) নীট মুনাফা ৩,০৭৮,০০০-২,৩১৮,৭৫২= ৭৫৯,২৪৮ টাকা।

বিদেশে রপ্তানির সুযোগ থাকায় খুলনা অঞ্চলে চিংড়ি ঘেরের পাশাপাশি কাঁকড়া চাষ হচ্ছে ব্যাপক হারে। এতেকরে পোশাক শিল্প, চা-চামড়া, পাট, চিংড়ি প্রভৃতির পর কাঁকড়া রপ্তানি করে বিপুল পরিমান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। পাশাপাশি বিপুল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে এবং স্বচ্ছলতা বয়ে আনবে অসংখ্য পরিবারে। দেশ এগিয়ে যাবে রপ্তানি বানিজ্যে। তবে এ ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোকে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে।



সেই সাথে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকাও অনেক। কাঁকড়া চাষীদেরকে স্বল্প সুদে ঋণ প্রদান, কাঁকড়াকে প্রসেস করে রপ্তানিযোগ্য করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনে সহায়তা করতে হবে। তাহলেই কেবল কাঁকড়া চাষ ও রপ্তানিতে কাংখিত সাফল্য অর্জিত হবে। পাশাপাশি উপকূলীয় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দারিদ্র বিমোচনসহ জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন সাধিত হবে।


পিএনএস/দোজা/শাহাদাৎ

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন