প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা বন্ধ করুন

  

পিএনএস ডেস্ক : একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ছবিগুলো প্রকাশ করেছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে। ছবিতে দেখা যায়, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে তিনি যেসব নকল উদ্ধার করেছেন, সেসব স্তূপাকারে রাখা হয়েছে। ছবিটি দেখলেই বোঝা যাচ্ছে, আমাদের কোমলমতি ছেলেমেয়েদের একাংশ এখন পরীক্ষায় অসদুপায়ের আশ্রয় নিতে শুরু করেছে! প্রশ্ন হচ্ছে, তারা কাজটি কেন করছে?

উত্তরটা সহজ। তাদের আমরা এই ধারণা দিয়েছি যে যেনতেনভাবে পাস করতে পারলেই কেল্লাফতে। আর কেল্লাফতের ব্যাপারটাকে আমরা প্রায় সব পরীক্ষায় নিয়ে এসেছি। এ কারণে পরীক্ষায় জালিয়াতির ব্যাপারটা প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে চাকরির নিয়োগ পরীক্ষা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।

আমাদের দেশের প্রথম চারটি পাবলিক পরীক্ষার মেধা মূল্যায়নের ব্যাপারটি একেবারে সোজাসাপটা। কিছু প্রশ্ন থাকবে, যার বেশির ভাগেরই উত্তর মুখস্থ করে লিখে ফেলা সম্ভব। যে যত বেশি মুখস্থ করতে পারে, তার পরীক্ষায় সাফল্য বেশি। শুধু স্কুল বা কলেজের পরীক্ষা নয়, শুনেছি চাকরির পরীক্ষায়ও জানতে চাওয়া হয় ‘পানামা খালের গভীরতা কত?’ এ ধরনের পরীক্ষাপদ্ধতি শিক্ষার্থীকে শিখতে তো অনুপ্রাণিত করেই না, এমনকি তারা পড়তেও আগ্রহী হয় না! তাদের সবার লক্ষ্য থাকে পরীক্ষায় পাস করা বা জিপিএ-৫ পাওয়া।

প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার কথা ধরা যাক। আগেকার প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় ২০ শতাংশ ছেলেমেয়ে অংশ নিত, ফলে সবার মেধার মূল্যায়ন হতো না—এ রকম অদ্ভুত কিছু যুক্তি দিয়ে আজ থেকে বছর আটেক আগে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ এই পাবলিক পরীক্ষার সূচনা করা হয়েছে। গত আট বছরে এই পরীক্ষা চালুর ফলে আমাদের শিক্ষার্থীদের কী উপকার হয়েছে, তা নিয়ে আজ সহজে প্রশ্ন তোলা যায়।

গণিত অলিম্পিয়াডের কারণে দেশের গণিত শিক্ষার হালহকিকত সম্পর্কে আমাকে কিছুটা ওয়াকিবহাল থাকতে হয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেরও প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জন করতে পারছে কি না, তা দেখার জন্য ২০১১ সাল থেকে বাংলা ও গণিতে তাদের দক্ষতার একটি পরিমাপ করা হচ্ছে। ন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাসেসমেন্ট (এনএসএ) নামের এই কার্যক্রম প্রতি দুই বছর অন্তর হয়। তৃতীয় ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের দৈবচয়ন পদ্ধতিতে বাছাই করে তাদের দক্ষতার পরিমাপক পদ্ধতিটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। ২০১১ সালের সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, পঞ্চম শ্রেণি উত্তীর্ণ ৬৭ শতাংশ শিক্ষার্থী গণিতে কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। ২০১৩ সালে এই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৭৫ শতাংশ আর ২০১৫ সালে দেখা যাচ্ছে পঞ্চম শ্রেণির কাঙ্ক্ষিত গাণিতিক দক্ষতা অর্জনে ব্যর্থ শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৯০ শতাংশ!!! তার মানে, ওরা কিছুই শিখছে না।

প্রশ্ন হতে পারে, এই সময়কালে কোন নতুন ঘটনা আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাকে প্রভাবিত করেছে, যার কারণে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির এই ক্রমাবনতি। উত্তর একটাই, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা। এই পরীক্ষার কারণে, বিশেষ করে গ্রামগঞ্জে সবাই এখন সার্টিফিকেটের পেছনে দৌড়াচ্ছে। এবং এটাও এখন জানা হয়ে গেছে যে পড়ালেখা না করে যেনতেনভাবে এই পরীক্ষায় ‘ব্যাপক সাফল্য’ অর্জন করা যায়। আর ওই পরীক্ষায় নম্বর পাওয়া যায় অনেক!!! শোনা যায়, মূল্যায়নকালে শিক্ষকেরা ঝুড়ি উজাড় করে নম্বর দিতে ভালোবাসেন।

বলা যায়, আমাদের প্রাথমিক উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ কোনো কিছু না শিখেই চলে আসছে হাইস্কুলে। সেখানে এসে তারা পড়ে যাচ্ছে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা এবং তার পরের দুটি পরীক্ষার কবলে। ১২ বছরের স্কুলিংয়ে পৃথিবীর আর কোথাও চার–চারটি পাবলিক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হয় না। যদি কেবল পরীক্ষা চালু করেই শিক্ষার মান উন্নত করা যেত, তাহলে কোরিয়া, জাপান কিংবা সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো প্রতিদিনই পরীক্ষা নিত। বলা হয়ে থাকে, ফিনল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে উন্নত। বলা বাহুল্য, সেখানে ১৮ বছর পর্যন্ত ছেলেমেয়েদের কোনো পাবলিক পরীক্ষা দিতে হয় না।

এবারের পিইসি পরীক্ষায় ব্যাপকভাবে প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। ফাঁস হওয়ারই কথা। গত এক দশকে পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িত কারও কোনো শাস্তি হয়েছে বলে শোনা যায়নি। কাজেই লোকে তাতে উৎসাহিত হবেই। আর কোনো শিক্ষার্থী যদি জানে আগের রাতে সে পরীক্ষার প্রশ্ন পেয়ে যাবে, তাহলে আগেভাগে পড়ালেখা করে তার সময় নষ্ট করার দরকার কী?

প্রাথমিক পরীক্ষাটা একেবারেই খারাপ। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে সেখানে আছে সৃজনশীল মুখস্থ পদ্ধতির বড় ভাই ‘দক্ষতা পরিমাপক’ প্রশ্ন। এসব ‘হাবিজাবি’ পদ্ধতি চালু করে গ্রামের নিরীহ অভিভাবকদের আতঙ্কে ফেলে দেওয়া হয়েছে। তাই আগে যে কোচিং সেন্টারগুলো জেলা সদরে যুৎ করতে পারত না, সেগুলো এখন গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছে। বেশির ভাগ অভিভাবকের ধারণা, কোচিং না করালে তাঁর সন্তান জিপিএ-৫ পাবে না। আর তাহলেই সর্বনাশ।

জিপিএ-৫-এর ব্যাপারটা যে মোটেই বিশ্বমানের নয়, তার বড় প্রমাণ আমাদের গণিত অলিম্পিয়াডের সফল শিক্ষার্থীরা। এদের দুজন সিলেটের আসিফ ই এলাহী ও সিরাজগঞ্জের সাজিদ আখতার চলতি বছর বিশ্বের অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয় কেমব্রিজে পড়তে গিয়েছে। এই দুজনের কেউ এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পায়নি।

কোমলমতি ছেলেমেয়েদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এই অমানবিক পরীক্ষাপদ্ধতি কত ভয়াবহ এক যন্ত্রণা ও আতঙ্কে পরিণত হয়েছে, সেটার একটি প্রমাণ মিলেছে এবারের জেএসসি পরীক্ষার সময়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একদল পরীক্ষার্থীকে নিয়ে নৌকাডুবি হলে কয়েকজন পরীক্ষার্থী মারা যায়। আর বেঁচে যাওয়া পরীক্ষার্থীদের ভেজা কাপড়ে ‘মহান জেএসসি পরীক্ষা’ দিতে হয়েছে!

মুনির হাসান: সাধারণ সম্পাদক, গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি।

পিএনএস/জে এ /মোহন

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech