পিএনএস ডেস্ক: রেকর্ড খেলাপি ঋণ ও দেড় লাখ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতি নিয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার নতুন পরিচালনা পর্ষদ দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নিয়েছেন নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালকও (এমডি)। ওই দিনই অনুষ্ঠিত হয়েছে পরিচালনা পর্ষদের প্রথম সভা। আমানতকারীদের আস্থা ফেরানো, তারল্য সঙ্কট মেটানো, খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার- এমন পাঁচটি বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে নতুন নেতৃত্বকে। এ দিকে এত দিনে দায়িত্বে থাকা পাঁচ ব্যাংকে পাঁচজন প্রশাসক শিগগিরই ফিরে আসবেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকে, যাদিও এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। কবে তারা ফিরে আসবেন এ বিষয়ে আজ রোববার গভর্নর প্রশাসকদের সাথে বৈঠক করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেনসিক অডিট ও অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ (একিউআর) অনুযায়ী, একীভূত হওয়া পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি ইতোমধ্যে দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি। একই সাথে কিছু ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার ৯৮ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, ব্যাংকগুলোর ব্যালেন্স শিটে যেসব ঋণ সম্পদ হিসেবে দেখানো হচ্ছে, তার বড় অংশই বাস্তবে আদায়যোগ্য নয়। ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন পর্ষদ ও এমডির জন্য এটি শুধু একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; বরং দেশের সবচেয়ে কঠিন ব্যাংক পুনর্গঠনের পরীক্ষা।
ঋণের পাহাড়, মূলধনের সঙ্কট : সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, একটি ব্যাংকের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ঋণ। সেই ঋণ নিয়মিত আদায় হলে ব্যাংক সুদ আয় করে, আমানতের বিপরীতে মুনাফা দেয় এবং নতুন ঋণ বিতরণ করতে পারে। কিন্তু সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ভিত্তি তৈরি হয়েছে এমন পাঁচটি ব্যাংক নিয়ে, যাদের অধিকাংশ ঋণই এখন মন্দ বা আদায়-অযোগ্য। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেনসিক অডিট অনুযায়ী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ৯৬ শতাংশ ঋণই মন্দ ঋণ। ইউনিয়ন ব্যাংকে এই হার প্রায় ৯৮ শতাংশ। গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে ৯৫ শতাংশের বেশি, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকে ৬২ শতাংশ এবং এক্সিম ব্যাংকে প্রায় ৪৮ শতাংশ ঋণ ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে পাঁচটি ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে দেড় লাখ কোটি টাকারও বেশি। এমন পরিস্থিতিতে নতুন ব্যাংকের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- এই বিশাল মূলধন ঘাটতি কিভাবে পূরণ হবে?
পাঁচ ব্যাংক থেকে এস আলম নিয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ৬৩৪ কোটি টাকা : একীভূত হওয়া পাঁচ ইসলামী ব্যাংক থেকে সবচেয়ে বেশি অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে এস আলম। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী আলোচ্য পাঁচ ব্যাংক থেকে এস আলম নিয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ৬৩৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে ৪৫ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা। এরপর ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে ২৩ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা। গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক থেকে ১৩ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক থেকে ১২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা এবং এক্সিম ব্যাংক থেকে নিয়েছে ৬ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা। নামে-বেনামে লুট করা এসব অর্থের বেশির ভাগই বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলে বিভিন্ন তদন্তে উঠে এসেছে।
নজরুল ইসলাম মজুমদার ও শিকদার গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারির দীর্ঘ ছায়া : পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শুধু এস আলমই ব্যাংক লুট করেনি, শিকদার গ্রুপ, নাসা গ্রুপের নজরুল ইসলাম মজুমদার, বেক্সিমকো গ্রুপের সালমান এফ রহমান আরো অনেক অলিগার্ক শ্রেণী ব্যাংকগুলো থেকে কোনো প্রকার নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে পানির মতো জনগণের আমানতের অর্থ বের করে নিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংক পুনর্গঠনের পাশাপাশি অর্থ উদ্ধারের অভিযান সফল না হলে কেবল নতুন ব্যবস্থাপনা দিয়ে এই সঙ্কট কাটানো কঠিন হবে।
নতুন পর্ষদের সামনে পাঁচটি বড় চ্যালেঞ্জ : নতুন পরিচালনা পর্ষদের সামনে অন্তত পাঁচটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত. আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। গত কয়েক বছরে এই ব্যাংকগুলোর বহু গ্রাহক সময়মতো নিজের জমা অর্থ তুলতে পারেননি। সীমিত পরিমাণ নগদ বিতরণ, দীর্ঘ লাইন এবং অনিশ্চয়তা মানুষের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করেছে। ফলে নতুন ব্যাংকের সবচেয়ে বড় মূলধন হবে গ্রাহকের বিশ্বাস। দ্বিতীয়ত, তারল্য সঙ্কট মোকাবেলা। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে বিশেষ তারল্যসহায়তা দিলেও পরিস্থিতির পুরোপুরি উন্নতি হয়নি। নতুন ব্যবস্থাপনাকে প্রতিদিনের নগদ প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে হবে। তৃতীয়ত, খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার। দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি মূলধন ঘাটতির বড় কারণ খেলাপি ঋণ। এসব ঋণের বড় অংশ উদ্ধার করতে না পারলে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার উন্নতি সম্ভব নয়। চতুর্থত. পাঁচটি আলাদা ব্যাংককে বাস্তবে একীভূত করা। প্রতিটি ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা, হিসাবরক্ষণ পদ্ধতি, গ্রাহক তথ্যভাণ্ডার এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আলাদা। এগুলো একত্র করা সময়সাপেক্ষ এবং অত্যন্ত জটিল কাজ। পঞ্চমত, দক্ষ ও স্বচ্ছ করপোরেট গভর্ন্যান্স নিশ্চিত করা। অতীতের অনিয়ম থেকে শিক্ষা নিয়ে পেশাদার ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে না পারলে পুনর্গঠনের পুরো উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আমানতকারীর আস্থা ফিরবে কিভাবে : বিশ্লেষকদের মতে, নতুন পর্ষদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত গ্রাহকদের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করা। সেজন্য পর্যাপ্ত নগদ অর্থ নিশ্চিত করতে হবে। এটিএম ও অনলাইন ব্যাংকিং নিরবচ্ছিন্ন রাখতে হবে। রেমিট্যান্স ও এলসি সেবা স্বাভাবিক রাখতে হবে। পুনর্গঠনের অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে হবে। কারণ, গ্রাহক যদি প্রয়োজনের সময় নিজের টাকা তুলতে না পারেন, তাহলে নতুন লোগো, নতুন এমডি কিংবা নতুন পর্ষদ- কোনোটিই আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারবে না।
পিএনএস/আনোয়ার
দেড় লাখ কোটি টাকার ঘাটতি নিয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের যাত্রা
19-07-2026 12:53PM

