মুসলিম সভ্যতায় মরক্কোর অবদান

  07-07-2026 02:28PM


পিএনএস ডেস্ক: উত্তর আফ্রিকার দেশ মরক্কোর দাপ্তরিক নাম ‘কিংডম অব মরক্কো’। ইসলামের ইতিহাসে মরক্কো মাগরিব নামে পরিচিত। এর উত্তরে ভূমধ্যসাগর, পশ্চিমে আটলান্টিক সাগর, দক্ষিণে পশ্চিম সাহারা এবং পূর্বে আলজেরিয়া অবস্থিত। মরক্কো বৈচিত্র্যময় ভূপ্রকৃতির অধিকারী। এতে রয়েছে সুউচ্চ আটলাস পর্বতমালা, উর্বর উপকূলীয় সমভূমি, সাহারা মরুভূমি এবং দীর্ঘ উপকূল।

মরক্কোর অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হলো—ফসফেট ও সারশিল্প, কৃষি, পর্যটন, মোটরগাড়ি ও উত্পাদনশিল্প, সমুদ্রবন্দর ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ইত্যাদি। দেশটির আয়তন চার লাখ ৪৬ হাজার ৫৫০ বর্গ কিলোমিটার এবং ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান অনুসারে এর জনসংখ্যা তিন কোটি ৬৮ লাখ ২৮ হাজার ৩৩০ জন। মরক্কোর জনসংখ্যার প্রায় শত ভাগ মুসলিম।

খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর যুগেই উত্তর আফ্রিকায় মুসলিম অভিযান শুরু হয়েছিল। বর্তমান মরক্কো মুসলমানদের অধীনে আসে উমাইয়া শাসনামলে। প্রখ্যাত মুসলিম সেনাপতি উকবা বিন নাফি (রহ.) মরক্কো জয়ে অসামান্য অবদান রাখেন। তিনি ৬৭০ খ্রিস্টাব্দে কারাউইনে সেনা কেন্দ্র স্থাপন করেন। ৬৮২ খ্রিস্টাব্দে আটলান্টিক সাগরের তীরবর্তী অঞ্চলে এক অভিযানে তিনি শহীদ হন। পরবর্তীতে মুসা বিন নুসায়ির (রহ.)-এর নেতৃত্বে উত্তর আফ্রিকার বিজয় অভিযান সম্পন্ন হয়। যদিও বার্বাররা মুসলিম হওয়ার আগ পর্যন্ত তারা কখনো পুরোপুরি ইসলামী খেলাফতের আনুগত্য স্বীকার করেনি।

৭৮৮ খ্রিস্টাব্দে আব্বাসীয় শাসকদের নিপীড়নের শিকার ও হুসাইনি বংশধর প্রথম ইদ্রিস সুসংহত মরক্কোয় ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। উদীয়মান শিয়া মতবাদ প্রতিরোধে ইদ্রিসি বংশের শাসকরা মালেকি মাজহাবকে ধর্মীয় মতাদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেন। মরক্কোয় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত একাধিক রাজবংশ বা শাসক গোষ্ঠির পরিবর্তন হয়েছে, তবে তা কখনো অমুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে যায়নি। ১৯১২ সালে ট্রিয়েটি অব ফেজ নামক চুক্তির মাধ্যমে মরক্কো ফরাসি বশ্যতা স্বীকার করে নেয়। ১৯৫৬ সালে দেশটির ফ্রান্সের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে।

মুসলিমরা মরক্কো জয় করার পর তারা আফ্রিকান দেশটিকে ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি চর্চার কেন্দ্রে পরিণত করেছিলেন। সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে ওমর ও সুফিয়ান ইবনে ওয়াহাব (রা.), তাবেয়ি উকবা বিন নাফে, হাসসান বিন নোমান, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর আজাদকৃত দাস ইকরামা (রহ.)-এর মতো মহান মনীষীরা সেখানে ইসলামী শিক্ষা বিস্তারে অবদান রাখেন। এছাড়াও মুসা ইবনে নুসাইর (রহ.) উত্তর মাগরিবে ইসলামী শিক্ষা বিস্তারে বিশিষ্ট আরব পণ্ডিতদের নিয়োগ দেন। ফলে ইসলামী সভ্যতায় মরক্কো বহুমুখী অবদান রাখতে সক্ষম হয়।

মাগরিব বা মরক্কো ইসলামী সমাজ ও সভ্যতায় চিন্তার বিকাশে অনন্য অবদান রাখেন। বহু চিন্তাশীল ও গবেষক জন্ম নেন এই ভূমিতে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ইবনু রুশদ। যিনি একই সঙ্গে ফকিহ, বিচারক, দার্শনিক ও চিকিৎসক ছিলেন। তিনি ইসলামী ও পশ্চিমা জ্ঞান-বিজ্ঞানের মধ্যে সংযোগ স্থাপনে প্রয়াসী হন। ফলে তিনি ধর্মীয় বিধানগুলোতে যুক্তির আলোকে ব্যাখ্যা করেন এবং পশ্চিমা দর্শনের নির্মোহ বিশ্লেষণ করেন।

মরক্কোর আরেকজন বিখ্যাত মনীষী ভূগোলবিদ ও চিকিৎসক আল ইদরিসি। আল ইদরিসি ভূগোল বিদ্যাকে অনুমানের পরিবর্তে সুদৃঢ় বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করান। তাঁর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো : পৃথিবীর গোলাকার আকৃতি, নিরক্ষরেখার অস্তিত্ব, জলবায়ু অঞ্চল এবং জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ, বায়ুপ্রবাহের দিক ও বৃষ্টিপাতের উপর পর্বতের প্রভাব নির্ণয় করা। তিনি তৎকালীন পরিচিত বিশ্বের একটি গোলাকার মানচিত্রও তৈরি করেছিলেন।

মরক্কোর অবদান শুধু শুধু বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা শিল্পকলা ও স্থাপত্য পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। যার ভেতর বিখ্যাত কয়েকটি হলো : কারাউইন, ফেজ, মাহদিয়া, সিজিলমাসা, তিয়ারত ও মুসলিম স্পেনের কর্ডোভা।

মাগরিব অঞ্চলে স্থাপত্যকলার নিদর্শন হিসেবে ধর্মীয় স্থাপত্য যেমন : মসজিদ, জামে মসজিদ ও রিবাত রয়েছে, তেমনি বেসামরিক স্থাপত্য যেমন : প্রাসাদ, আবাসিক ভবন ও বৃহৎ জল ব্যবস্থাও রয়েছে। জামে মসজিদগুলোর নির্মাণ রীতি প্রায় একই ধরনের ছিল। অধিকাংশ মসজিদে একটি উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ, নামাজ কক্ষ, মিহরাব, মার্বেল স্তম্ভ, স্ফটিকের আলোকছিদ্র ও গম্বুজ বিদ্যমান ছিল। কারাউইন জামে মসজিদ মাগরিব অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে বিবেচিত হয়।

ইসলামী সভ্যতায় মাগরিবের একটি অনন্য অবদান রিবাত স্থাপন করা। রিবাত এমন একটি স্থাপনা—যা আধ্যাত্মিকতা চর্চা, ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা ও সামরিক প্রয়োজন পূরণ এই তিন উদ্দেশ্যে নির্মিত হতো। রিবাতগুলো ছিল প্রতিরক্ষামূলক দুর্গ, যার মধ্যে একাধিক কক্ষ ও একটি মসজিদ থাকত।

মরক্কোর ইসলামী স্থাপত্যশৈলীর বিশেষ বৈশিষ্ট্য এর অলঙ্করণ। যার মধ্যে আছে বিভিন্ন ধরনের খোদাই, খিলান, স্তম্ভ, স্তম্ভশীর্ষ (ক্যাপিটাল) ও খোপ বা নীশ। এসব শিল্পকর্ম মার্বেল, পাথর, প্লাস্টার ও কাঠের ওপর খোদাই ও উৎকীর্ণ করা হয়।

তথ্য ঋণ : বই : তারিখুল মাগরিব ফি আসরিল ইসলামী; প্রবন্ধ : মুসাহামাতুল মাগরিবিল আরাবিয়্যি ফি ইজদিহারিল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইলামিয়্যাতি; আল হাদারাতুল ইসলামিয়্যা ফিল মাগরিব;


পিএনএস/মোআ

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন