পিএনএস ডেস্ক : চার দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ইরাকের ফুটবল ইতিহাসে বিশ্বকাপে তোলার নায়ক তিনি। বাছাইপর্বে মেক্সিকোয় বলিভিয়ার বিপক্ষে জয়সূচক গোল করে ইরাককে বিশ্বকাপের টিকিট এনে দেন স্ট্রাইকার আইমান হুসেইন। এখন বিশ্বমঞ্চে ইরাকের এই ফুটবলারের গল্প শুধু সাফল্যের নয়, বরং বেদনা, সংগ্রাম ও অবিচল স্বপ্নেরও।
মাত্র ১২ বছর বয়সে স্থানীয় একটি দলে ফুটবল খেলতে শুরু করেছিলেন আইমান। সেই সময়ই পরিবারের জন্য নতুন বাড়ি নির্মাণের উপকরণ কিনতে গিয়ে তার বাবা সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। এর কয়েক বছর পর অপহৃত হন তার বড় ভাই। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আইমান বলেন, ‘আমি ফুটবল ছেড়ে দিয়ে পরিবারের দায়িত্ব নিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার মা তা হতে দেননি।’
তিনি বলেন, ‘মা আমাকে বলেছিলেন, এটা তোমার স্বপ্ন। আমি জানি। আর তোমাকে সেই স্বপ্ন পূরণ করতেই হবে।’ সেই স্বপ্নই আজ পর্যন্ত আঁকড়ে ধরে রেখেছেন তিনি।
সহিংসতার ছায়ায় বেড়ে ওঠা
১৯৯৬ সালে ইরাকের উত্তর-মধ্যাঞ্চলের আল-হাওয়িজা জেলার আল-সাফরা গ্রামে জন্ম আইমানের। কৃষিকাজ ও ভেড়া পালন ছিল তাদের পরিবারের জীবিকার প্রধান উৎস। ২০০৮ সালে নেমে আসে ভয়াবহ ট্র্যাজেডি। সে সময় কিরকুক ও আশপাশের এলাকা সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। ইরাকি সেনাবাহিনীর সদস্য আইমানের বাবা আল-কায়েদার হাতে নিহত হন।
আইমান স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘নির্মাণাধীন নতুন বাড়ির জন্য কিছু জিনিসপত্র কিনতে গিয়েছিলেন বাবা। কয়েক ঘণ্টা পর ফোন আসে—আপনার বাবাকে হত্যা করা হয়েছে, তার মরদেহ হাসপাতালে রয়েছে।’
তার বাবার বুকে গুলি করা হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘প্রথমে আমরা বিশ্বাসই করতে পারিনি। পরে হাসপাতালে গিয়ে বাবার নিথর দেহ দেখতে পাই। এটা আমাদের সবার জন্য ভয়াবহ এক বিপর্যয় ছিল।’
বাবার মৃত্যুর পর আইমান পরিবারকে গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার অনুরোধ করেন। কিন্তু বড় ভাই, যিনি বাবার মৃত্যুর পর সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন, গ্রাম ছাড়তে রাজি হননি।
তাই পালিয়ে না গিয়ে আইমান যোগ দেন ইরাক যুব ফুটবল দলে। কয়েক বছর পর তুরস্কে একটি প্রশিক্ষণ ক্যাম্প শেষে দেশে ফিরে জানতে পারেন, তার বড় ভাই নিখোঁজ। সেই সময় এলাকাটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং তার ভাইকে অপহরণ করা হয়েছিল।
আইমান বলেন, ‘এরপর থেকে আমরা তার কোনো খবরই পাইনি।’
‘বিনা পারিশ্রমিকেও খেলতে রাজি ছিলাম’
ব্যক্তিগত জীবনের একের পর এক ট্র্যাজেডির মধ্যেই উত্থান ঘটতে থাকে তার ফুটবল ক্যারিয়ারের। ২০১২ সালে ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলের শীর্ষ লিগের ক্লাব দোহুক তাকে দলে ভেড়ায়। সেটিই ছিল তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া মুহূর্ত।
তিনি ১ কোটি ৮০ লাখ ইরাকি দিনার (প্রায় ১৪ হাজার ডলার) চুক্তি এবং মাসিক ১২ লাখ দিনার (প্রায় ৯২০ ডলার) বেতনে ক্লাবটির সঙ্গে যুক্ত হন।
আইমান বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমি বিনা পারিশ্রমিকেও খেলতে রাজি ছিলাম। তখন জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গে খেলার সুযোগ পাওয়া আমার কাছে কত বড় ব্যাপার ছিল, তা কল্পনাও করা কঠিন। দোহুকের হয়ে খেলা তখন আমার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল।’
এর ১৮ মাস পর তিনি বাগদাদে পাড়ি জমান। আল-শোর্তা, আল-তালাবা ও আল-জাওরার মতো ক্লাবের হয়ে খেলেন এবং একসময় লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতাও হন। সর্বশেষ কাতারের আল খোর ক্লাবে খেলার পর তিনি ইরাকে ফিরে আল কারমা ক্লাবে যোগ দেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ১০ লাখ ডলারের চুক্তিতে খেলা আইমান বর্তমানে ইরাকের সবচেয়ে দামি ফুটবলার। তবে এত সাফল্যের মাঝেও তার মনে সবসময় বাবা ও বড় ভাইয়ের স্মৃতি জাগরুক থাকে।
তিনি বলেন, ‘আমি সবসময় চাইতাম বাবা ও ভাই বেঁচে থাকুক, আমার অর্জনগুলো দেখুক এবং আনন্দের মুহূর্তগুলো আমার সঙ্গে ভাগ করে নিক।’
সাফল্যের স্মরণীয় অধ্যায়
২০১৬ সালে এএফসি অনূর্ধ্ব-২৩ এশিয়ান কাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে কাতারের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে গোল করে ইরাককে রিও অলিম্পিকের টিকিট এনে দেন তিনি। ২০২৩ সালে ২৫তম আরবিয়ান গালফ কাপে তিন গোল করে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতার স্বীকৃতি পান এবং দলকে শিরোপা জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
২০২৪ সালে ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে ২-১ গোলের জয়ে একটি গোল করে ইরাককে প্যারিস অলিম্পিকে খেলার যোগ্যতা অর্জনে সহায়তা করেন।
বিশ্বকাপে ‘মেসোপটেমিয়ার সিংহ’
ইরাক জাতীয় দল ‘লায়ন্স অব মেসোপটেমিয়া’ নামে পরিচিত। দলটি সর্বশেষ বিশ্বকাপ খেলেছিল ১৯৮৬ সালে, আইমানের জন্মেরও এক দশক আগে। এবার তাই দলটির সবচেয়ে বড় ভরসা আইমান হুসেইন।
ইরাকের গোলরক্ষক ও সহ-অধিনায়ক জালাল হাসান বলেন, ‘আইমান এমন একটি নাম, যার আলাদা পরিচয় দেওয়ার প্রয়োজন নেই। শুধু ইরাক নয়, পুরো অঞ্চল ও আরব ফুটবলে তার পারফরম্যান্সই তার পরিচয়। তিনি উচ্চমানের একজন স্ট্রাইকার। বিশ্বকাপে দল তার ওপর অনেকটাই নির্ভর করবে। তার উপস্থিতিই পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।’
ইরাকের সাবেক অধিনায়ক ও জাতীয় দলের সর্বোচ্চ গোলদাতা হুসেইন সাঈদও আশাবাদী।
তিনি বলেন, ‘দলের ওপর এবং খেলোয়াড়দের মধ্যে আইমানের প্রভাব স্পষ্ট। ব্যক্তি হিসেবেও সে অত্যন্ত বিনয়ী ও ভালো মানুষ। আমি আশা করি, এই ইতিবাচক গুণ বিশ্বকাপে দলকে গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে যেতে সহায়তা করবে।’
ফুটবল সাংবাদিক জায়েদ আলসারাজ বলেন, ‘আমরা সবাই চাই আমাদের দল এবং বিশেষ করে আবু তুবার—যে নামে ইরাকিরা স্নেহভরে আইমানকে ডাকে—বিশ্বকাপের সময় মানসিক, শারীরিক ও কারিগরি দিক থেকে পুরোপুরি প্রস্তুত থাকুক।’
ভক্তদের আক্ষেপ
তবে বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজের দেশকে সমর্থন করতে ইরাকি সমর্থকদের বড় বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। ইরাকি ফুটবল সমর্থক সাইফ আল-বায়াতি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাওয়া সহজ নয়। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ চলছে, তখন ইরাকিদের জন্য তা প্রায় অসম্ভব।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটাই একমাত্র সমস্যা নয়। একটি টিকিটের দামই ৩ হাজার ডলারের বেশি। সেখানে গিয়ে অন্তত দুই সপ্তাহ থাকা-খাওয়ার খরচ মিলিয়ে ১৫ হাজার ডলারেরও বেশি লাগতে পারে। সাধারণ কোনো ইরাকি সমর্থকের পক্ষে এত টাকা খরচ করা সম্ভব নয়।’
তবু সব বাধা পেরিয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে ইরাকের কোটি মানুষের স্বপ্ন এখন এক নামেই—আইমান হুসেইন।
সূত্র: আল জাজিরা
পিএনএস/এমএইউ
বাবা খুন ও ভাইয়ের সন্ধান নেই, বিশ্বকাপে তিনিই এখন ‘ইরাকের ভরসা’
17-06-2026 05:10PM

