ভারতফেরত পাসপোর্ট যাত্রীদের সীমাহীন হয়রানি

  21-10-2016 10:33PM

পিএনএস, বেনাপোল: বন্ডেড এরিয়ার পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে সীমান্ত রক্ষী বাহিনী পাসপোর্ট ধারী কোনো ব্যক্তিকে তল্লাশী করতে পারে না। কিন্তু কে মানে আইন-বিধি? বছরের পর বছর বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বজিবি) এ কাজটি করে চলেছে নির্দ্বিধায়। বিজিবি এই তৎপরতার মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা কিছু মালামাল উদ্ধার করছে সত্যি, কিন্তু এর চেয়ে ঢের অভিযোগ যাত্রী হয়রানির।
শুধু বিজিবি কেন, যাত্রী হয়রানির গুরুতর অভিযোগ রয়েছে ইমিগ্রেশনে দায়িত্বরত পুলিশ ও কাস্টমস কর্মীদের বিরুদ্ধেও। লাজ-লজ্জার মাথা খেয়ে ইমিগ্রেশন পুলিশ বাংলাদেশ ভূখণ্ডে ঢোকার মুখে সবার সামনেই টাকা চাইছে ভারত থেকে আসা যাত্রীদের কাছে। আবার লাগেজ রুল মান্য করে আনা জিনিসপত্রও জব্দ করার হুমকি দিয়ে পুলিশ ও কাস্টমসের কর্মীরা যাত্রীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছেন কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা।
এসব অপকর্ম সবার চোখের সামনে ঘটলেও দেখার যেন কেউ নেই। ফলত অসন্তোষ বাড়ছে বৈধ পথে গমনাগমনকারী যাত্রীদের মধ্যে। কিন্তু তারা হয়রানির ভয়ে কিছুই বলতে পারছেন না।
নো-ম্যান্সল্যান্ড পার হয়েই ভারত থেকে আসা যাত্রীদের প্রথমেই বাংলাদেশ ইমিগ্রেশন পুলিশের মুখোমুখি হতে হয়। সেখানে ইমিগ্রেশন পুলিশের এক কর্মকর্তার নেতৃত্বে কয়েকজন সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। তাদের কাজ যাত্রীর কাছে পাসপোর্ট আছে কি-না এবং ভারতীয় ইমিগ্রেশন থেকে পাসপোর্টে ঠিকঠাক সিল মারা হয়েছে কি-না তা যাচাই করা। কিন্তু অভিযোগ, পাসপোর্ট পরীক্ষার নামে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা যাত্রীদের কাছে প্রস্তাব দেন সিল মারার। পাসপোর্ট প্রতি সিল মেরে দেওয়ার বিনিময়ে তারা ১শ’ টাকা করে দাবি করেন।
সম্প্রতি ভারতে ক্যানসারের চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরেন যশোর শহরের প্রবীণ বাসিন্দা নাহার। ইমিগ্রেশন পুলিশ বাংলাদেশ ভূখণ্ডে ঢোকামাত্র তাকে ১শ’ টাকার বিনিময়ে পাসপোর্টে সিল মারার প্রস্তাব দেন। তার সঙ্গে থাকা (মেডিকেল অ্যাটেনডেন্ট) ছেলে এই প্রস্তাব না মানায় দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘ঠিক আছে, সামনে যান, ওখানে পাসপোর্ট প্রতি ২শ’ টাকা করে দেওয়া লাগবে।’
একই ভাবে প্রায় সব যাত্রীর কাছে প্রস্তাব দেওয়া হয় বলে জানাচ্ছেন ভারত ফেরত পাসপোর্ট যাত্রীরা। তারা বলছেন, ঝামেলা এড়াতে অনেক যাত্রীই পুলিশের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান। টাকা লেন-দেন হয় প্রকাশ্যে।
সংশিষ্ট সূত্র জানায়, স্থলপথে বিদেশ থেকে আসা একজন যাত্রী সর্বোচ্চ ২০০ মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৬ হাজার টাকা) দামের মালামাল শুল্ক-কর ছাড়াই সঙ্গে আনতে পারবেন বলে কাস্টমসের ‘ব্যাগেজ রুল’-এ উল্লেখ আছে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, সংশি¬ষ্টরা এ বিধান তোয়াক্কা করে না।
সম্প্রতি রকিব হোসেন নামে যশোর শহরের এক বাসিন্দা চিকিৎসা শেষে বেনাপোল হয়ে দেশে আসছিলেন। তার ব্যাগে কোনো অবৈধ মালামাল পায়নি কর্তৃপক্ষ। ছেলের জন্য যে খেলনাটি তিনি কিনে আনছিলেন, সেটিকেই ‘অবৈধ’ বলে চিহ্নিত করেন কাস্টমসের এক কর্মী। কথিত অবৈধ পণ্যটি ছাড় করাতে ওই কাস্টমস কর্মী যে টাকা দাবি করেন, তা খেলনাটির দামের চেয়ে কয়েকগুণ। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যান রকিব। উপায়ন্তর না পেয়ে তিনি ফোন করেন বেনাপোলের এক সংবাদকর্মীকে। ওই সংবাদকর্মী আসছেন শুনে ঘাবড়ে যান কাস্টমস কর্মী। তিনি তড়িঘড়ি ওই যাত্রীকে ইমিগ্রেশন থেকে ঠেলে বের করে প্রধান সড়কে এনে ট্যাক্সি ডেকে এক প্রকার জোর করে উঠিয়ে যশোরের পথে রওনা করিয়ে দেন।
ইমিগ্রেশন ভবন পার হওয়ার পরই যাত্রীদের অনেককে মুখোমুখি হতে হয় বিজিবির। চেকপোস্টের কাছাকাছি রাস্তার ওপর বিভিন্ন জায়গায় খোলা জায়গায় যাত্রীদের লাগেজ তল্লাশি করেন বিজিবি সদস্যরা। ভারত থেকে আসা দেশি-বিদেশি পাসপোর্টধারী যাত্রীরা এখানে বিজিবি সদস্যদের হাতে হয়রানির শিকার হন বলে অভিযোগ রয়েছে।
রোদ-বৃষ্টিতে কাস্টমস গেটের পাশে উদ্ভিদ সংগনিরোধ অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে রাস্তার ওপর যাত্রীদের লাগেজ তলল্লাশি করেন বিজিবির কয়েক সদস্য। কখনো কখনো যাত্রীদের লাগেজসহ নিয়ে যাওয়া হয় পাশেই চেকপোস্ট আইসিপি ক্যাম্পে।
ভারত থেকে আসা বাংলাদেশি যাত্রী নীলা পারভীন জানান, ইমিগ্রেশন গেট পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিজিবি সদস্যরা তাদের লাগেজ তল্লাশি করেন। রাস্তায় দাঁড়িয়ে তাদের সমস্ত ব্যাগ খুলে একটি একটি করে মালামাল বের করে বিজিবিকে দেখাতে হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘কলকাতা থেকে ফিরে নিজ দেশে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে আমাকে।’
‘বেনাপোল চেকপোস্ট কাস্টমস গেট পার হওয়ার পর যেভাবে বিজিবি সদস্যরা যাত্রীদের ডাকে আবার কখনো তাড়িয়ে ধরে তল্লাশি করে, তা দেখে মনে হয় আমরা কোনো অসভ্য সমাজে বাস করছি’, মন্তব্য করেন চায়না খাতুন নামে এক যাত্রী।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘৫০০ টাকা ভ্রমণকর দিয়ে বৈধ পথে যাতায়াতের সময় যদি এভাবে হয়রানি হতে হয় তার চেয়ে দুঃখজনক আর কিছু হতে পারে না।’
এ ব্যাপারে বেনাপোল চেকপোস্ট আইসিপি বিজিবি ক্যাম্পের নায়েব সুবেদার নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা কাস্টমস থেকে যাত্রী বের হলে ব্যাগেজ রুলের বাইরেও মালামাল পাচ্ছি। কাজেই আমরা তো তল্লাশি করবই।’
ইমিগ্রেশন ভবনের কাছাকাছি তো বটেই বেনাপোল বাজার এবং কয়েক কিলোমিটার দূরবর্তী আমড়াখালীসহ রাস্তার বিভিন্ন স্থানে এভাবে একের পর এক লাগেজ তল্লাশি করা হয় যাত্রীদের।
বেনাপোল পোর্ট থানা পুলিশের বিরুদ্ধে পোশাক পরিহিত অবস্থায় ও সাদা পোশাকে বেনাপোল বাজারের বিভিন্ন স্থানে প্রায়ই যাত্রীদের আটকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশি যাত্রী মিনু খাতুন অভিযোগ করে বলেন, ‘ বন্দরের ২২ নম্বর গোডাউনের সামনে আমার কাছ থেকে সম্প্রতি বেনাপোল পোর্ট থানার পুলিশ পরিচয়ে সাদা পোশাকধারী ব্যক্তিরা জোর করে ২শ’ টাকা আদায় করেছে।’
ঢাকার আলমগীর হোসেন নামে এক যাত্রী জানান, কাস্টমস পার হয়ে বিজিবি সদস্যদের ব্যাগ খুলে দেখানোর পর আবার চার কিলোমিটার দূরে যশোর-বেনাপোল সড়কের আমড়াখালি চেকপোস্টে সব মালামাল নামাতে হয় গাড়ি থেকে।
তিনি বলেন, ‘আমি একজন ইমপোর্টার। ব্যবসায়িক কাজে প্রায়ই ভারতে যেতে হয়। ফিরে আসার সময় বিজিবি সদস্যরা পদে পদে হয়রানি করেন। শুধু আমড়াখালি নয় পথে নতুনহাট কলেজের সামনেসহ বিভিন্ন স্থানে ব্যাগ খুলতে খুলতে একেবারে নাজেহাল হয়ে যেতে হয়।’
মুন্সীগঞ্জ এলাকার মনির হোসেন বলেন, ‘লাগেজ তল্লাশি হওয়া উচিৎ। কিন্তু একই সংস্থার লোক একই ব্যাগ বিভিন্ন স্থানে বার বার তল্লাশি করছে। এটা অগ্রহণযোগ্য।’
মহাসড়কে চেকপোস্ট বসিয়ে তলাশি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বেনাপোল চেকপোস্ট আইসিপি বিজিবি ক্যাম্পের নায়েব সুবেদার নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বেনাপোল বাজার থেকে নানা যানবাহনে অনেক যাত্রী ভারতীয় বিভিন্ন পণ্য নিয়ে যাচ্ছেন। সেগুলো আমড়াখালি বিজিবি চেকপোস্টে ধরা পড়েছে।’
এতো তল্ল¬াশির পর কীভাবে যাত্রীরা ‘অবৈধ’ মালামাল নিয়ে যান জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিজিবির চোখ ফাঁকি দিয়ে সাইড দিয়ে নিয়ে তারপর বাজার থেকে উঠাচ্ছে।’
‘সাইড’ বলতে কী বুঝায় এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘চেকপোস্টের কাছাকাছি সাদিপুর, গাতিপাড়া ও দৌলতপুর সীমান্তের যে কোনো পথে পণ্য উঠাচ্ছে বিজিবির চোখ ফাঁকি দিয়ে।’
তবে বিজিবির এই তৎপরতাকে ‘বেআইনি’ বলছেন শুল্ক কর্মকর্তারা। বেনাপোল চেকপোস্ট কাস্টমস তল্লাশি কেন্দ্রের একজন রাজস্ব কর্মকর্তা (সুপারিনটেনডেন্ট) বলেন, ‘বন্ডেড এলাকার পাঁচ কিলোমিটার এর মধ্যে আইন প্রয়োগকারী কোনো সংস্থার লোক পাসপোর্টধারী কোনো যাত্রীকে তল্লাশি করতে পারবে না।’
রাস্তায় বিজিবির তলাশি সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে ওই শুল্ক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমি তাদের কাছে এ ব্যাপারে লিখিত দেখাতে বলেছি। কিন্তু তারা কিছু দেখাতে পারেনি। আইন অনুযায়ী তারা এটা করতে পারে না।’
হয়রানির অভিযোগ থাকলেও এই বাড়তি তল্লাশির কারণে অবশ্য বিজিবি সদস্যরা প্রায়ই নানা অবৈধ মালামাল আটক করতে সক্ষম হচ্ছেন। চলতি সপ্তায় মোবাইল সিমসম্বলিত এক ধরনের গেনজিসহ বাংলাদেশি এক যাত্রীকে আটক করেন বিজিবি সদস্যরা। বেআইনি ভাবে আনা মুদ্রাও জব্দ হচ্ছে প্রায়ই। এই সাফল্য অবশ্য গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এসেছে।
সাধারণ যাত্রীদের দাবি, সবার লাগেজ গড়ে তল্লাশি নয়, সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চানানো হোক। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, ভারত থেকে আসা বেশির ভাগ যাত্রীই কোনো বেআইনি পণ্য বহন করেন না। অথচ বিনা কারণে তারা পদে পদে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

পিএনএস/মো: শ্যামল ইসলাম রাসেল

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন