পিএনএস ডেস্ক : পর্নোগ্রাফির দর্শক যারা, কিংবা যারা এটি দেখতে ভালোবাসেন, কিংবা যারা ঘৃণাবোধ করেন; তাদের কেউই সম্ভবত ভাবেন না পর্দার ওপারে যে নারীটি ব্যবহৃত হচ্ছেন, যৌনক্রিয়ার নামে যৌনসন্ত্রাসের শিকার হচ্ছেন ‘স্বেচ্ছায়’, তার জীবনটা কেমন। তবে পর্ন স্টারদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ভেবেছেন জোনাথন ভ্যান মারেন।
জোনাথন কানাডার জীবনমুখী লেখক ও ব্লগার। পর্ন ইন্ডাস্ট্রি, পর্ন আসক্তি এবং পর্ন স্টারদের জীবন নিয়ে গবেষণা করছেন তিনি। আর তা করতে গিয়ে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শেলী লুবেন নামের সাবেক এক পর্ন স্টারের।
পর্ন ইন্ডাস্ট্রিতে আট বছরের দুর্বিষহ জীবন যাপন থেকে মুক্ত হয়ে বর্তমানে পিংক ক্রস ফাউন্ডেশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন তিনি। পর্ন শিল্পীদের পর্ন ইন্ডাস্ট্রি থেকে বের করে আনার কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। আর লুবেনের সাক্ষাতকারের ভিত্তিতে একটি ব্লগ লিখেছেন জোনাথন।
ব্লগের শুরুতেই একটি প্রশ্ন রাখেন জোনাথন। জিজ্ঞেস করেন, ‘পর্ন যদি খারাপ হয়, তবে কেন এত মানুষ পর্ন নিয়ে কাজ করে?’
নিজেই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেন শুরুতে। জোনাথন মনে করেন, ‘পর্নোগ্রাফিকে যৌন সহিংসতা, ধর্ষণের দৃশ্যত উদযাপন কিংবা নারীদের অমর্যাদা হিসেবে উল্লেখ করে যারা বিতর্কে জড়ান তাদের কাছে এটি খুবই কমন প্রশ্ন। এ প্রশ্নের নানা উত্তর হতে পারে। কিছু নারী টাকার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে যৌন ব্যবসায় ঢুকে পড়েন। তাদের অনেকে (বেশিরভাগ নয়) যৌন সন্ত্রাসের শিকার; বাকিরা পর্ন ব্যবসাকে গ্ল্যামারাস এবং যৌন ব্যবসা হিসেবে চিন্তা করে ধোঁকা খেয়েছেন।’
পর্ন ইন্ডাস্ট্রিতে নারীরা কী অভিজ্ঞতা পার করেন তা বের করতে শেলী লুবেনের সাক্ষাতকারের আশ্রয় নেন জোনাথন। সেটাই তুলে ধরেন ব্লগে।
১৯৯০ সালে পর্ন স্টার হিসেবে কাজ শুরু করেন শেলি লুবেন। খুব অল্প বয়সেই যৌন কর্মী হিসেবে জীবন শুরু হয় তার। লুবেন জানায়, `যৌন কর্মী হিসেবে জীবন শুরুর পর আমি যেন ধ্বংস হয়ে গেলাম। আমাকে মিথ্যে বলা হত। বলা হত যে, যেকোন যৌন রোগ থেকে আমি নিরাপদ থাকব এবং টাকা কামাতে পারব। আমি ছিলাম বাপ-মা পরিত্যক্ত, একা। তাই ভাবনার কিছু ছিল না। ক্যামেরার সামনে সেক্স করতে শুরু করলাম। কিন্তু একসময় বুঝতে পারলাম এটি সবচেয়ে খারাপ আর অন্ধকার ব্যাপার যেখানে আমি অন্তর্ভূক্ত হলাম।’
যৌন রোগ ছড়ানোর ভীতি
নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে জোনাথনকে লুবেন জানান, যৌনসম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে অনেকেই কনডম ব্যবহার করতে চাইত না। আর গোটা পর্ন ইন্ডাট্রিতে তা প্রচলিত হয়ে গেল। তাদের জোর করে অসুরক্ষিত যৌন সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য করা হত।
‘আমি আপনাকে বলতে পারব না কতজন মানুষ নিজেদের যৌন রোগের ব্যাপারটি লুকিয়ে ফেলেছিল।’ আক্ষেপ করে বলেন লুবেন।
নিজের প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যানের উল্লেখ করে লুবেন জানান, কেবল গেল বছর ছোট একটি দলের মধ্যেই ৪ জনের শরীরে এইচআইভি পাওয়া গিয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আমরা জানতে পারলাম বেশিরভাগ পর্ন স্টার একবার কিংবা বেশ কয়েকবার যৌন রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। এরমধ্যে ৬৬-৯৯ শতাংশই হার্পস-এ আক্রান্ত হয়েছিলেন। তারা তাদের হার্পস-আছে কিনা সেজন্য পরীক্ষা করান না। আর এজন্য দ্রুত যৌনরোগ ছড়িয়ে পড়ে তাদের মধ্যে।’
লস অ্যাঞ্জেলস জনস্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যের বরাতে লুবেন আরও জানান, ‘পরীক্ষায় দেখা গেছে হাজার হাজার মানুষ গনোরিয়াসহ বিভিন্ন যৌনরোগে ভুগছেন। যৌন রোগে আক্রান্ত হয়েছেন এমন মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ক্যালিফোর্নিয়াতে। সেকারণে যখনই কোন মানুষ পর্নে ক্লিক করছেন তার মানে তিনি কোন না কোনভাবে যৌন পাচারে অবদান রাখছেন, যৌনরোগ ছড়ানোর ক্ষেত্রে অবদান রাখছেন, মাদকাসক্তিতে অবদান রাখছেন।’
নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে লুবেন বলেন, ‘প্রত্যেক পর্ন স্টারই মাদকাসক্ত নন, তবে তাদের বেশিরভাগই তাই। আমি আপনাকে বলতে পারব না কখন আমি সেরে উঠেছিলাম। আমার পিটিএসডি হয়েছিল। আমার সবধরনের বৈকল্য এবং মারাত্মক ট্রমা দেখা দিয়েছিল।’
লুবেনের পর্ন ইন্ডাস্ট্রিতে আগমনের কারণ
লুবেনের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে জোনাথন তার ব্লগে লিখেছেন, ‘পর্ন ইন্ডাস্ট্রির ওপর গবেষণা করতে গিয়ে এ গল্প আমি বার বার পড়ি। আর সে কারণেই আমার মনে জন্মেছে একটি প্রশ্ন। কেন সে যৌন শোষণের এ ইন্ডাস্ট্রিতে প্রথম কাতারে চলে আসলো?’
উত্তর দিলেন লুবেন। জানালেন তার জীবনের অভিজ্ঞতার কথা।
লুবেন বলেন, ‘আমার বয়স যখন ৯ বছর তখনই এক কিশোর আর তার বোন মিলে আমার ওপর যৌন সন্ত্রাস চালায়। আর সেই ছোট বয়সেই সমকামী আর বিপরীতকামী-এ দুধরনের অভিজ্ঞতাই আমি পেয়ে গিয়েছিলাম। আর একইসময়ে টেলিভিশনও আমার ওপর প্রভাব ফেলেছে। হরর ম্যুভি এবং যৌনতা সংক্রান্ত ম্যুভিগুলো দেখার অনুমোদন ছিল। আর সেকারণে সহিংসতা থেকেই প্রেম আর যৌনতার শিক্ষা আমি পেয়েছিলাম। এক্ষেত্রে পরিবারের অবহেলাও ছিল। কারণ পরিবার আমাদের এসব দেখতে দিত।’
‘এরপর আমি বড় হলাম। আমার মধ্যে বিদ্রোহ জেঁকে বসল। কারণ আমার বাবা আমার জীবনের সঙ্গে খুব একটা সম্পর্কযুক্ত ছিলেন না। আমি ছেলেদের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে জড়াতে শুরু করলাম। কারণ ছেলেগুলো বলতো তারা আমাকে ভালোবাসে। তাই আমার মনে হল আমি যদি কোন একজন ব্যক্তির সঙ্গে যৌন সম্পর্ক গড়ে তুলি তবে আমি ভালোবাসা পাবো।
অবাধ্য হয়ে ওঠার কারণে একদিন আমার বাবা আমাকে রাস্তায় ছুঁড়ে দিলেন। নিজের এলাকা সান ফারনান্দোতে আমার শেষ।
এরপর যাত্রা শুরু হল লস অ্যাঞ্জেলসে। সে এক পর্ন উপত্যকা। সেখানে এক যৌন দালালের সঙ্গে দেখা হল। সে আমাকে ৩৫ ডলারের প্রলোভন দেখালো। এরপর সে......। শারীরিকভাবে আমি তার কাছ থেকে বাঁচতে চাইলাম, কারণ সে খুব সহিংস ছিল। এরপর দেখা হল আরেক দালালের সঙ্গে। এরপর শুরু হল অন্ধকার জগতের পথ চলা।
‘আমি পতিতাবৃত্তিকে ঘৃণা করতে শুরু করলাম, অপরাধবোধে ভুগতে লাগলাম, তারপর আমার মধ্যে ক্রমশ এ জগত থেকে বেঁচে ওঠার আকাঙ্ক্ষা তীব্র হতে শুরু করল।’
প্রবেশ সহজ, বের হওয়া কঠিন
তবে অন্ধকার সেই জগত থেকে ফিরে আসাটা অত সহজ ছিল না বলে জানালেন লুবেন। তার কারণ হিসেবে লুবেণ উল্লেখ করলেন, তার কোন শিক্ষা ছিল না। সেইসঙ্গে এও জানান, পতিতাবৃত্তিতে যোগ দেয়া নারীদের বেশিরভাগেরই শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকে না। তাছাড়া পর্ন স্টারদের বেশিরভাগেরই আর্থিক স্বচ্ছলতা থাকে না। আর সে কারণে চাইলেও তারা এ পেশা পরিবর্তন করে অন্য পেশায় যেতে পারেন না।
কীভাবে পর্নোগ্রাফি দিন দিন সহিংস হয়ে উঠছে তা নিয়ে ডঃ গেইল ডাইনসের করা গবেষণার ওপর ভিত্তি করে লুবেনকে পাঠ করার চেষ্টা চলছিল বলে জানান জোনাথন। সেইরকম সহিংসতা লুবেনের অভিজ্ঞতায় প্রতিফলন ফেলেছিল কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন করা হয় লুবেনকে।
-‘অবশ্যই’। জবাব লুবেনের।
এ পর্ন স্টার জানায়, ‘সহিংসতা আমিও পার করে এসেছি, তবে আমি যৌন কর্মে লিপ্ত হয়েছিলাম কারণ আমি তখন নিজের পরিবার, মা-বাবার প্রতি ক্ষুব্ধ ছিলাম। তবে আমি সব ধরনের সহিংসতায় নিশ্চুপ ছিলাম না। মাঝে মাঝে আমি ভেগে যেতাম।’ লুবেন মনে করেন নারীদের এখন এ পেশা থেকে সরে আসা উচিত।
পর্ন ইন্ডাস্ট্রি কী যৌন পাচার বাড়াচ্ছে?
পর্ন ইন্ডাস্ট্রি যৌন পাচার বাড়াচ্ছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে দৃঢ়ভাবে লুবেন বলেন, ‘অনেক মানুষই মনে করে পর্নোগ্রাফি যৌন পাচার বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং সেটাই ঠিক। এটিকে গলাকাটা ব্যবসা বলা হয়, কারণ এটি পাচার করে।’
এ ইন্ডাস্টিতে যারা কাজ করেন, তাদের সবসময় একটা ধোঁকার মধ্যে রাখা হয় বলে জানান লুবেন। কারো যৌন রোগ আছে কিনা তা পরীক্ষা করার ব্যবস্থা আছে সত্যি। কিন্তু সেইসব ক্লিনিক কিংবা চিকিৎসক সবাই ভুয়া বলে জানান এ পর্ন স্টার।
এছাড়া পর্নোগ্রাফাররা মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দেন বলে অভিযোগ করেন লুবেন। ‘এ দৃশ্যটি একবার করলে, আর করানো হবে না, কিংবা এ দৃশ্যে অংশ নিলে এরকম টাকা পাবে।’ এরকম অনেক প্রতিশ্রুতিই দেয়া হয়।
লুবেন জানান, ‘এ ধরনের ফিল্মগুলো সাধারণত প্রাইভেট লোকেশন, প্রাইভেট ম্যানশন এবং হোটেল রুমগুলোতে তৈরি করা হয়। পুরোপুরি পুরুষ নিয়ন্ত্রিত সেটের ভেতর তরুণীদের সেসব দৃশ্যে অংশ নিতে হয়।’
তিনি জানান, একবারই এ দৃশ্যে অংশ নিতে হবে বলা হলেও বার বারই তাকে এমন দৃশ্যায়নে অংশ নিতে হয়েছে। তা না করতে চাইলে টাকা না দেয়া কিংবা পরিবারের কাছে ভিডিও দিয়ে দেয়া, কিংবা সুনামহানির হুমকি দেয়া হয়। এমনকি শারীরিকভাবে আঘাত করা এবং আইনী ব্যবস্থা নেয়ারও হুমকি দেয়া হয়। এটা যৌন পাচার। পর্ন ইন্ডাস্টিতে প্রত্যেক পর্ন স্টারকেই অন্তত একবার হলেও পাচারের শিকার হতে হয়েছে।
তবে আট বছরের দুর্বিষহ জীবন কাটানোর পর শেষ পর্যন্ত পর্ন ইন্ডাস্ট্রি থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন শেলী লুবেন। তাকে বাঁচিয়েছিলেন এক ধর্ম যাজক। পরে তাকে বিয়েও করেছেন লুবেন। তবে পর্ন ইন্ডাস্ট্রির সেই ভয়াবহ স্মৃতি কাটাতে আরও দশ বছর কেটে গেছে লুবেনের।
২০০৭ সালে পিংক ক্রস ফাউন্ডেশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন তিনি। পর্ন শিল্পীদের পর্ন ইন্ডাস্ট্রি থেকে বের করে আনার কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। পর্ন শিল্পীদের দেয়া হচ্ছে আশার আলো। পর্ন ইন্ডাস্ট্রির আড়ালে থাকা অন্ধকার জগৎ এবং সেখানকার যন্ত্রণা সম্পর্কে তরুণদের সতর্ক করা হয় প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোগে।
পর্নোগ্রাফি সন্ধানীদের উদ্দেশ্যে শেলীর বার্তা
ফোনেই শেলী লুবেনের সাক্ষাৎকারটি নেয়া হয়েছে বলে জানান, জোনাথন। ফোন রাখার আগে শেষ আরেকটি প্রশ্ন করা হয় তাকে। জিজ্ঞেস করা হয়, যারা পর্নোগ্রাফি খুঁজে বেড়ায় তাদের উদ্দেশ্যে আপনার কী বলার আছে?
উত্তরে শেলী লুবেন বলেন, ‘যারা পর্নোগ্রাফি খুঁজে বেড়াচ্ছো, তারা নিজের ধ্বংস ডেকে আনছো। পরিবারের ধ্বংস ডেকে আনছো। স্ত্রীর ধ্বংস ডেকে আনছো। আমি বলতে পারবো না, ঠিক কতজন পর্ন আসক্ত যে নিজেদের পরিবার আর চাকরি হারিয়েছে।
এটা খুবই দুঃখজনক। শিশু পর্নের কথাই চিন্তা করো। একবার চিন্তা করে দেখো, কত ছোট ছোট শিশুকে মাদক দেয়া হচ্ছে এবং ধর্ষণ করা হচ্ছে।’ সেটা জানার পরও কীভাবে কেউ পর্ন দেখার জন্য ক্লিক করতে পারে? প্রশ্ন রাখেন শেলী।
পিএনএস/সামির/শাহাদাৎ
সাবেক পর্ন স্টারের বিভীষিকাময় জীবনকথা
05-08-2015 09:06PM

