কৃষি গবেষণায় পদক পেলেন তানোরের কৃষক নূর মোহাম্মদ

  

পিএনএস , নিজস্ব প্রতিবেদক : ‘ধানই যার ধ্যান আর ধানই যার জ্ঞান’তিনি হলেন তানোর পৌর এলাকার গোল্লাপাড়া গ্রামের আর্দশ কৃষক নূর মোহাম্মদ। এলাকায় লোক তাকে জানে ‘ধান পাগল’ নূর মোহাম্মদ বলে। কৃষি খাতের উন্নয়নে অবদান রাখায় ‘বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরুস্কার ১৪২১’ (ব্রোঞ্জ) পদক পেয়েছেন। রোববার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর হাতে এই পদক তুলে দেন।

কৃষি উন্নয়ন ও গবেষণায় প্রতি বছরে বিশেষ অবদানের জন্য বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তি পর্যায়ে ১০টি ক্যাটাগরিতে ৫টি স্বর্ণ, ৯টি রৌপ্য ও ১৮টি ব্রোঞ্জ পদক দেয়া হয়। কৃষি গবেষণা এবং সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি আবিষ্কার, বাণিজ্যিক খামার, বনায়ন, পশু পালন, পোল্ট্রি ও মৎস্য খামারে বিশেষ অবদানের জন্য এ পদক দেয়া হয়।

স্বর্ণ পদক বিজয়ীদের প্রত্যেকেই ১৮ ক্যারেটের ২৫ গ্রাম ওজনের ১টি স্বর্ণ পদক ও নগদ ১ লাখ টাকা, রৌপ্য পদক বিজয়ীদের প্রত্যেকেই ২৫ গ্রাম ওজনের ১টি রৌপ্য পদক এবং নগদ ৫০ হাজার টাকা ও ব্রোঞ্জ পদক বিজয়ীদের প্রত্যেকেই ১টি ব্রোঞ্জ পদক ও নগদ ২৫ হাজার টাকা পেয়েছেন।

নূর মোহাম্মদ একজন প্রগতিশীল ও উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন কৃষক। তিনি সংকরায়ণ ও বাছাইকরণের মাধ্যমে আউশ, আমন ও বোরো ধানের বিভিন্ন জাত উদ্ভাবন করেন। এ পর্যন্ত সংরায়ণের পর তাঁর কৌলিক লাইনের সংখ্যা ২০০। তিনি বোরো ধানের স্বল্পমেয়াদী ১৩০ দিনের লাইন উদ্ভাবন করেছেন। যার ফলে কৃষক আগাম ফসল উৎপন্ন করতে পারছে।

তাঁর উদ্ভাবিত ধানের লাইনগুলো উচ্চ ফলনশীল,সরু,সুগদ্ধি ও খরাসহিষ্ণু হওয়ায় খরাপ্রবণ বরেন্দ্র এলাকা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে ধান উৎপাদন বৃদ্ধিতে ব্যাপক অবদান রাখবে। তিনি বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট,বাংলাদেশ পরমানু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট,বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও নিজের বাছাইকৃত, স্থানীয় ও সুগদ্ধি জাত এবং উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড জাত সংগ্রহ করে শস্য মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর উদ্ভাবিত প্রযুক্তি কৃষকের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে এবং কৃষকরা এ প্রযুক্তিতে চাষ করে লাভবান হচ্ছেন।

তিনি দীর্ঘ ৩০ বছরের অধিক সময় ধরে এই পেশাকে ধ্যান ও জ্ঞান দিয়ে নিরন্তন কাজ করে যাচ্ছেন। কৃষিকে ভালোবেসে ধান গবেষণা শুরু করেন নব্বই দশকে। তারই স্বীকৃতি স্বরূপ ২০০৫ সালে কৃষিতে জাতীয় পুরুস্কার অর্জন করেন তিনি। এখন তাঁর একটাই চাওয়া। বেঁচে থাকা অবস্থায় নিজের উদ্ভাবিত ধান জাতগুলোর সরকারি স্বীকৃতি পাওয়া।

তাঁর সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে এলাকার অনেক কৃষক ও শিক্ষিত বেকার তরুণরা বরেন্দ্র অঞ্চলে উচ্চ ফলনশীল এসব ধান চাষে আগ্রহী হয়েছে, যা সমাজ গঠনমূলক একটি সফল উদ্যোগ। দেশ গড়ার এই কৃতিত্বপুর্ণ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তাঁকে এই পদকে ভূষিত করা হয়।

এ নিয়ে তানোর দুবইল গ্রামের জাতীয় পরিবেশ পদক প্রাপ্ত কৃষক ইউসুফ আলী মোল্লা জানান, নূর মোহাম্মদ শুধু আমার বন্ধুই নয় আমাদের গর্ব। এই পদক পাওয়াতে আমি খুবই আনন্দিত হয়েছি। পাশাপাশি আমি মনে করি, আরো নতুন নতুন ধানের জাত উদ্ভাবনে তিনি এগিয়ে যাবেন। তাঁর উত্তর উত্তর সাফল্য কামনা করি।

এ নিয়ে ধান গবেষক নূর মোহাম্মদ বলেন, বঙ্গবন্ধু কৃষি পদক পেয়ে আমি খুবই আনন্দিত। প্রথমেই আমি অভিনন্দন জানাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে। তাঁর দেয়া এই পুরস্কার পেয়ে আরও নতুন নতুন ধানের জাত উদ্ভাবনের পথ গতিশীল হবে। সারা বাংলাদেশে আমার উদ্ভাবিত জাতের ধান ছড়িয়ে দেয়ায় আমার মূল লক্ষ্য। আর ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গড়াতে আমার এই সাধনা।

তানোর উপজেলা কৃষি অফিসার মো: শফিকুল ইসলাম জানান, আমি খুবই আনন্দিত। কারণ উনি আমাদের তানোরের একজন নিবেদিত কৃষক। উনি পাওয়ার অর্থ হচ্ছে তানোরের মান-সম্মান বৃদ্ধি হয়েছে। তিনি দু’বার পদক পেলেন। কৃষিতে তাঁর অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁকে দেখে অনেকেই কৃষি কাজে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। এজন্যই আমরা নূর মোহাম্মদ সাহেবকে অভিনন্দন জানায় তানোর কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে।

তানোর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুহা: শওকাত আলী জানান, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁকে অভিনন্দন জানায়। কৃষক নূর মোহাম্মদ শুধু তানোরের নয় পুরো বরেন্দ্র অঞ্চলের গর্ব। আমি বিশ্বাস করি তাঁর এই পদক প্রাপ্তিতে সামনে কাজের গতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে এবং তাঁর উদ্ভাবিত ধানের জাতগুলো সারা বাংলাদেশে কৃষকদের মাঝে সাড়া জাগাবে।

কৃষক নূর মোহাম্মদ ‘বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরুস্কার ১৪২১’ পদক পাওয়ায় শুভেচ্ছা জানিয়েছেন ‘তানোর সাহিত্য পরিষদ’, বে-সরকারি গবেষণা সংস্থা ‘বারসিক’, ‘দুবইল কৃষক সংগঠন’, গোকুল-মথুরা গ্রাম উন্নয়ন সংস্থা ‘স্বপ্নচারী’, মোহর গ্রাম উন্নয়ন সংস্থা ‘স্বপ্ন আশার আলো’সহ বিভিন্ন সংগঠনের নেত্রীবৃন্দ।

পিএনএস/মোঃ শ্যামল ইসলাম রাসেল


 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech