বাংলা কিউআরের ফি নিয়ে ক্ষোভ, বাংলাদেশ ব্যাংকের পাল্টা যুক্তি

  11-07-2026 01:11PM

পিএনএস ডেস্ক: দেশে নগদবিহীন (ক্যাশলেস) লেনদেন ব্যবস্থা জোরদারে ১ জুলাই থেকে সব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও মার্চেন্ট পয়েন্টে সর্বজনীন ‘বাংলা কিউআর’ কোড প্রদর্শন ও ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, আগের সব পৃথক কিউআর কোডের পরিবর্তে এখন একটিমাত্র অভিন্ন বাংলা কিউআর কোড ব্যবহার করতে হবে। এর মাধ্যমে যে কোনো ব্যাংকের (যেমন ডাচ-বাংলা, ব্র্যাক, ইসলামী ব্যাংক) কিংবা মোবাইল আর্থিক সেবার (যেমন বিকাশ, নগদ) অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে সহজেই মূল্য পরিশোধ করা যাবে। পাশাপাশি যেসব প্রতিষ্ঠানে বাংলা কিউআর কোড থাকবে না, তাদের ট্রেড লাইসেন্স নবায়নে জটিলতা তৈরি হতে পারে বলেও সতর্ক করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

লেনদেনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, নিরাপত্তা বাড়ানো এবং দেশে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। তবে এ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (এমডিআর) বা সেবা ফি নিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, বাংলা কিউআর কোডের মাধ্যমে মার্চেন্ট পেমেন্টে ভ্যাটসহ সর্বনিম্ন ১ শতাংশ এমডিআর নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে নীতিমালায় বলা হয়েছে, গ্রাহকের কাছ থেকে কোনো অতিরিক্ত অর্থ কাটা হবে না। একজন ক্রেতা যে পরিমাণ টাকা পরিশোধ করবেন, তার ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাকাউন্ট থেকে ঠিক সেই পরিমাণ টাকা কাটা হবে।

তাহলে এই ১ শতাংশ ফি কে দেবে? কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, এই সেবা ফি মার্চেন্ট বা দোকানদারের প্রাপ্য অর্থ থেকে সমন্বয় করা হবে।

সহজ হিসাব: একজন ক্রেতা বাংলা কিউআর স্ক্যান করে এক হাজার টাকার পণ্য কিনলে তার অ্যাকাউন্ট থেকে এক হাজার টাকাই কাটা হবে। কিন্তু দোকানদারের অ্যাকাউন্টে জমা হবে প্রায় ৯৯০ টাকা। বাকি প্রায় ১০ টাকা (ভ্যাটসহ ১ শতাংশ এমডিআর) সেবা ফি হিসেবে কেটে নেবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা পেমেন্ট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান।

এই এক শতাংশ সেবা ফি বাধ্যতামূলক করার পর থেকেই মাঠপর্যায়ের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, বিশ্বের অনেক দেশেই এ কিউআর সেবা সম্পূর্ণ ফ্রি, সেখানে বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর এ খরচের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

রাজধানীর হাতিরপুল এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আমি পূবালী ব্যাংকের বাংলা কিউআর নিয়েছিলাম, যার সর্বনিম্ন চার্জ ছিল ৭ টাকা। গত ১ জুলাই থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বনিম্ন চার্জ ১০ টাকা নির্ধারণ করেছে। গভর্নর বলেছিলেন চার্জ কমাবেন, কিন্তু উল্টো বাড়ানো হলো, যা আমাদের মতো ব্যবসায়ীদের জন্য ক্ষতিকর। গভর্নর সাহেবের কাছে অনুরোধ, চার্জ কমিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বাস্তবসম্মত ও ব্যবসাবান্ধব চার্জ নির্ধারণ করুন।’

চকবাজারের এক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, ব্যাংক চাইলে বিনা খরচেও কিউআর সেবা দিতে পারে। অথচ ১ জুলাই থেকে অনেক ব্যাংকের ৩০ থেকে ৭০ পয়সার চার্জ বাড়িয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে। তার দাবি, নির্দিষ্ট কোনো মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বায়েজিদ আহমেদ নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের এত লাভ নেই যে আপনি ১ শতাংশ চার্জ বাধ্যতামূলক করে দেবেন। ক্যাশলেস বাংলাদেশ করতে হলে চার্জ ফ্রি বাংলা কিউআর ও পয়েন্ট অব সেল (পস) পেমেন্ট সিস্টেম লাগবে। চার্জ কমালে হবে না, জিরো (শূন্য) করতে হবে। পাশাপাশি মোবাইল ডাটার মূল্য কমাতে হবে এবং ইন্টারনেটের মেয়াদ প্রথা বন্ধ করতে হবে।’

বাংলা কিউআরের এ চার্জ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাধারণ মানুষ ও ভোক্তাদের মধ্যেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের মূল ভয় এ চার্জের ভার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সাধারণ মানুষের পকেটেই এসে পড়বে।

ফারহান সিদ্দিক রিফাত লিখেছেন, ‘যে টাকা বানাতে খরচ লাগবে না, সে টাকা খরচ করতে কেন খরচ লাগবে? কিউআর দিয়ে কী লাভ হলো? ব্যাংকের কার্ড থেকে পেমেন্ট করলে তো খরচ লাগে না, তাহলে কিউআরে কেন খরচ?’

গোলাম মোস্তফা রুয়ান্ডার উদাহরণ টেনে বলেন, ‘রুয়ান্ডার মতো দেশে কোনো কিউআর চার্জ নেওয়া হয় না! তো আমরা উন্নয়নশীল দেশ হয়ে কেন চার্জ দেবো? আমি ক্যাশে পে করবো, তাতে আমার সমস্যা কোথায়!’

আরিফুর রহমান মনে করিয়ে দেন নজরদারির কথা, ‘কিউআর ট্রানজেকশনে সবার আয়-ব্যয়ের হিসাব এনবিআরের নজরদারিতে থাকবে, ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি বন্ধ হবে। তবু নেট ফ্রি এবং উভয়দিকে চার্জ ফ্রি হলে মানুষ ভেবে দেখবে, নয়তো অধিকাংশ মানুষ এটি বয়কট করবে।’

আব্দুল করিম হিসাব কষে বলেন, ‘বাংলা কিউআর চালু করলে বছরে ২০ হাজার কোটি টাকা সেভ হবে নতুন নোট ছাপানো থেকে। সেখান থেকে ব্যবসায়ীদের ভর্তুকি না দিয়ে উল্টো হাজারে ১১ দশমিক ৫ টাকা কাটার মানে কী বুঝলাম না!’

ভোক্তা শিশির মজুমদার ও কামরুজ্জামান সুমন-এরমতে, দিনশেষে মার্চেন্টরা পণ্যের দাম বাড়িয়ে এ খরচের দায় ভোক্তার ওপরই চাপাবে। রাষ্ট্র যেখানে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে (রাজস্ব পরিকল্পনা ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ সহজ হওয়া), সেখানে সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করতে কোনো প্রকার চার্জ রাখাই উচিত নয়। পাশাপাশি পেমেন্ট পয়েন্টগুলোতে ফ্রি ওয়াইফাই সুবিধা থাকা দরকার।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, আমরা চাই ডিজিটাল লেনদেন শুরু হোক, তবে হাফডান (অর্ধেক সম্পন্ন) যেন না হয়। চালু হলো, এতে ধারণা করা হয় রাজস্ব বাড়বে, ব্যবসা বাড়বে। তবে মাঝপথে ভেঙে পড়ে। কারণ এর আগে ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্টার (ইসিআর) মেশিন দোকানে দোকানে দেওয়ার পর বাতিল হলো, ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) মেশিন আনা হলো সেটাও বাতিল হয়। আমরা মনে হয়, কিআর কোড অপরিপক্ব, ম্যাচিউরড হয়নি। আমরা এখনো অনলাইনে অভ্যস্ত হয়নি। এটাও চিন্তা করা দরকার যে হাজারে ১০ টাকা কেটে নেওয়া হচ্ছে, দোকানির হিসাব থেকে তাহলেতো দোকানি এ পণ্যের দাম বাড়াবে ২০ টাকা।

বাংলাদেশ দোকান মালিক ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি মো. নাজমুল হাসান মাহমুদ বলেন, দোকানির কাছ থেকে হাজারে ১০ টাকা হলে তো ৭০ লাখ দোকান ব্যবসায়ী সরকারের বিপক্ষে চলে যাবে। আমার পকেট থেকে কাটা হবে, আমি তাহলে অন্যখান থেকে পুষিয়ে নেবো এমনটা হয়। বাস্তবে সরকার অর্থ চাই। সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছিলাম উৎপাদকের কাছ থেকে ভ্যাট কাটা হোক, তাহলে কিউআরে কোনো অর্থ কাটা হতো না। সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলার জন্য এমনটা করা হতে পারে। এমডিআর পুনর্বিবেচনার দাবি জানাই।

ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের এই তীব্র ক্ষোভের বিপরীতে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং কৌশলগত ব্যাখ্যা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আর্থিক খাতের এই নিয়ন্ত্রক সংস্থার মতে, ১ শতাংশ এমডিআরকে অনেকেই অতিরিক্ত ব্যয় মনে করলেও, বাস্তবে এটি ব্যবসার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি লাভ নিশ্চিত করার একটি চমৎকার মাধ্যম।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, কিউআরভিত্তিক ডিজিটাল লেনদেন শুধু ব্যবসায়ীর নিট লাভ বাড়ায় না, বরং জাতীয় অর্থনীতিতে নগদ টাকা ছাপানো ও ব্যবস্থাপনার ব্যয় কমায়, আর্থিক স্বচ্ছতা বাড়ায়, করের আওতা বাড়ায় এবং করাপশন ও অর্থপাচার রোধে ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক ড. শাহ মো. আহসান হাবীব বলেন, ‘একটা সময় মানুষ ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারেও ভয় পেত, ব্যবসায়ীরাও এটি সহজে নিতে চাইতো না। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে আজ চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন; এখন ক্রেডিট কার্ডে পেমেন্ট করলে উল্টো নানা রকম ডিসকাউন্ট বা ক্যাশব্যাক অফার পাওয়া যায়। বাংলা কিউআরের ক্ষেত্রেও শুরুতে কিছুটা অনীহা থাকা স্বাভাবিক।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফর হোসেন খান বলেছেন, বর্তমানে নির্ধারিত ১ শতাংশ মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (এমডিআর) স্থায়ী নয়। ভবিষ্যতে বাংলা কিউআরের ব্যবহার ও লেনদেনের পরিমাণ বাড়ার পাশাপাশি ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এবং পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারদের (পিএসপি) মধ্যে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পেলে পরিচালন ব্যয় কমবে। এর ফলে এমডিআরের হারও ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

বর্তমানের ১ শতাংশ এমডিআর স্থায়ী নয়। ভবিষ্যতে কিউআর লেনদেন ও প্রতিযোগিতা বাড়লে পরিচালন ব্যয় কমবে, ফলে এমডিআরও কমানো হবে।— বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফর হোসেন খান

তাই তাৎক্ষণিক ক্ষোভ দূরে সরিয়ে আধুনিক, নিরাপদ ও দক্ষ ডিজিটাল অর্থনীতির স্বার্থে এটিকে একটি লাভজনক বিনিয়োগ হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তবে মাঠপর্যায়ের ক্ষোভ প্রশমন করে কীভাবে এ ব্যবস্থাকে জনপ্রিয় করা যায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যে কোনো নতুন প্রযুক্তির শুরুতে কিছু চ্যালেঞ্জ বা খাপ খাইয়ে নেওয়ার সমস্যা থাকে। মানুষের দীর্ঘদিনের নগদ লেনদেনের অভ্যাস পরিবর্তন হতে কিছুটা সময় লাগলেও, দীর্ঘমেয়াদে এই সর্বজনীন কিউআর ব্যবস্থা দেশের অর্থনীতি, ব্যবসায়ী এবং ভোক্তা-সবার জন্যই বড় কল্যাণ ও নিরাপত্তা বয়ে আনবে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের একজন রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, শুরুতেই এ প্রযুক্তিকে সরকারের রাজস্ব আয়ের উৎস বা ব্যাংকের অতি-মুনাফার হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা মোটেও উচিত হয়নি। বরং এ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল সবাইকে এই ডিজিটাল ইকোসিস্টেমে অভ্যস্ত ও উৎসাহিত করা।

শুরুতেই বাংলা কিউআরকে রাজস্ব আদায় বা ব্যাংকের মুনাফার মাধ্যম না করে, মানুষকে ডিজিটাল লেনদেনে অভ্যস্ত ও উৎসাহিত করাই বেশি জরুরি ছিল।— অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ জনি

তিনি বলেন, এমডিআর ১ শতাংশের পরিবর্তে প্রাথমিক অবস্থায় শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ (দশমিক পাঁচ শতাংশ) করা যেতে পারে। এ ছাড়ের মাধ্যমে যদি দেশের লাখ লাখ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে বাংলা কিউআরের আকৃষ্ট করা যায়, তবে সেটিই হবে বড় সাফল্য। কারণ এ মুহূর্তে রাজস্ব আদায়ের চেয়ে সব শ্রেণির মানুষকে এ আধুনিক ব্যবস্থার আওতায় আনাই (ইন্টিগ্রেশন) রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বেশি জরুরি।


পিএনএস/রাআ

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন