একই পরিবারের ৪ জনকে হত্যা : যেভাবে বেঁচে যান সিফাত

  26-06-2026 10:44AM


পিএনএস ডেস্ক: লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলায় ৭ বছর আগে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান কামাল হোসেন। অকালে স্বামীকে হারিয়ে ৩ মেয়ে ও ১ ছেলেকে নিয়ে বহু কষ্টে সংসার চালাচ্ছিলেন শাহিনুর বেগম (৩৮)। ত

বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে ওই সংসারে নেমে আসে চির অন্ধকার। একে একে শাহিনুর বেগম ও তার তিন মেয়ে- সায়মা আক্তার (২১), ইকরা আক্তার (১৭) ও শিফা আক্তারকে (৯) কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তবে, বাসায় না থাকায় বেঁচে যান একমাত্র ছেলে সিফাত হোসেন (১৮)।

সিফাত রায়পুর বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি এখানে কর্মরত। বৃহস্পতিবার সকালে সিফাত তার বাসার অদূরেই কর্মস্থলে চলে যান।

রায়পুর বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদ বলেছেন, “সিফাত সকালে দোকানে চলে আসে। বেলা ১১টার দিকে তার মা ও বোনদের কুপিয়ে হত্যার খবর আসে। আমার দোকানের পেছনেই তাদের বাসা। লোকজন জড়ো হয়ে ঘাতক যুবককে গণপিটুনি দেয়। ওই যুবক হাসপাতালে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে।”

একসঙ্গে মা ও তিন বোনের মৃত্যুতে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন সিফাত। প্রথমে ঘটনা শুনে বাসায় গিয়ে তিনি চিৎকার করে কান্না করতে থাকেন। তার কান্নায় এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। তাকে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে বণিক সমিতির নেতার বাসায় নিয়ে রাখা হয়। সেখান থেকে তাকে একবার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে তাকে গাড়িতে নিয়ে এসে ফের বণিক সমিতির নেতার বাসায় রাখা হয়।

পুলিশ ও স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ২০১৯ সালে সিফাতের বাবা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। তখন পরিবারের বড় মেয়ে রায়পুর মার্চেন্টস একাডেমিতে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন। অন্যরা বিভিন্ন শ্রেণিতে পড়ালেখা করতেন। ছোট মেয়ে শিফা প্রায় দুই বছর বয়সী ছিলেন। এর মধ্যে বড় মেয়ে সায়মা এসএসসি পাস করে আদমজী ক্যান্টমেন্ট কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে এইচএসসি পাস করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেলে ভর্তির জন্য চেষ্টা করেন। মেজো মেয়ে স্থানীয় লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন। ছোট মেয়ে স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছিল।

একমাত্র ছেলে সিফাত পড়াশোনার পাশাপাশি একটি দোকানে চাকরি নেন। সিফাত রায়পুর সরকারি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে বিক্ষুব্ধ জনতার ছোড়া ইট-পাটকেলে পুলিশের ৬ থেকে ৭ সদস্য আহত হন।

নিহত সায়মার সাবেক ক্লাসমেট প্রমি আক্তার বলেছেন, “সায়মা মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল। সে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে বের হয়েছে। এর মধ্যে সে মেডিকেল ভর্তির জন্যও চেষ্টা করেছিল। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছে। তবে, ভর্তি হয়েছে কিনা জানি না।”

বণিক সমিতির নেতা সাইফুল ইসলাম মুরাদ বলেন, “সিফাতের বাবা মারা যাওয়ার পর তা মা খুব কষ্টে সংসার চালিয়েছে। বছরখানেক ধরে সিফাত আমার এখানে কাজ করে। এখন তার তিন বোনসহ মাকেও কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ছেলেটির আর কেউ নেই এ পৃথিবীতে। গ্রামের বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন কে আছে, তা জানি না।”

রায়পুর উপজেলার স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. বাহারুল আলম জানান, হাসপাতালে আনা পাঁচজনের মধ্যে মা ও দুই মেয়েকে মৃত ঘোষণা করা হয়। পরে গুরুতর আহত ইকরাকে ঢাকায় পাঠানো হলে পথে তার মৃত্যু হয়।

রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন মিয়া বলেন, “একই পরিবারের ৪ জনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তাদের বাড়ি কুমিল্লায়। পরিবারের একমাত্র ছেলে বেঁচে আছে। স্বজনদেরকে খবর দিতে বলা হয়েছে। নিহতদের মরদেহ হাসপাতালের মর্গে আছে। আশা করি, দ্রুত সময়ের মধ্যে স্বজনরা এসে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ বুঝে নেবেন।ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে অন্তর মজুমদার (২৮) নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করেছে ক্ষুব্ধ জনতা। শুনেছি, তার বাড়ি নোয়াখালীর সুবর্ণচরে। তবে, সঠিক ঠিকানা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।”



পিএনএস/এমএইউ

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন