পিএনএস ডেস্ক : দেখতে অনেকটা ধনিয়া গাছের মতো। উচ্চতা দুই থেকে তিন ফুট। সবুজ পাতার ফাঁকে ছোট ছোট সাদা ফুলে বেশ আকর্ষণীয় মনে হলেও এর আড়ালেই লুকিয়ে আছে ভয়ংকর বিপদ। এই আগাছার নাম পার্থেনিয়াম। চুয়াডাঙ্গাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার মাঠ-ঘাট, রাস্তার ধারে, ফসলি জমি ও পতিত ভূমিতে দ্রুত বিস্তার লাভ করছে বিষাক্ত এই উদ্ভিদ।
কৃষিবিদ ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি মূলত উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় দেখা যায়। কিন্তু এখন বাংলাদেশেও এটা হচ্ছে। তাই এখনই নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে এটি কৃষি, পরিবেশ, গবাদিপশু ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হতে পারে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চুয়াডাঙ্গা সদর, আলমডাঙ্গা, দামুড়হুদা ও জীবননগর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পার্থেনিয়ামের উপস্থিতি দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী অঞ্চল, রাস্তার দুই ধারে, রেললাইনের পাশ, পতিত জমি এবং ফসলের মাঠের আশপাশে ব্যাপকভাবে জন্মাতে দেখা যাচ্ছে গাছটি। তবে অধিকাংশ মানুষই এর নাম কিংবা ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জানেন না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পার্থেনিয়াম (Parthenium hysterophorus) একটি আক্রমণাত্মক ও বিষাক্ত আগাছা। ধারণা করা হয়, এটি প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে বিভিন্ন উপায়ে বাংলাদেশে এসেছে এবং দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। গাছটির জীবনকাল মাত্র তিন থেকে চার মাস হলেও এ সময়ে একাধিকবার ফুল ও বীজ উৎপাদন করে। একটি গাছ থেকেই হাজার হাজার বীজ ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা বাতাস, পানি, যানবাহন এবং পশুপাখির মাধ্যমে নতুন এলাকায় ছড়িয়ে যায়।
দামুড়হুদা উপজেলার হোগলডাঙ্গা গ্রামের কৃষক লুৎফর হোসেন জানান, কয়েক বছর আগেও এ আগাছা তেমন দেখা না গেলেও বর্তমানে অনেক কৃষিজমির আশপাশে এটি জন্মাচ্ছে। এতে ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে।
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার মোমিনপুরের জয়নাল আলী নামের এক কৃষক বলেন, ‘এই গাছের কারণে আমরা আতঙ্কে আছি। জমির চারপাশে অনেক জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। গরু-ছাগলও মাঝে মাঝে খেয়ে ফেলে। দ্রুত এটি দমন করা প্রয়োজন।’
চুয়াডাঙ্গার সাবেক সিভিল সার্জন ডা. হাদী জিয়া উদ্দিন বলেন, ‘পার্থেনিয়ামের সংস্পর্শে এলে চর্মরোগসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। এটি অত্যন্ত ক্ষতিকর একটি উদ্ভিদ।’ তিনি আরও বলেন, পার্থেনিয়ামের পাতা, ফুল ও পরাগরেণু মানুষের শরীরে নানা ধরনের জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। এর সংস্পর্শে এলে অ্যালার্জি, চুলকানি, চর্মরোগ, চোখ জ্বালাপোড়া এবং শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। বাতাসে ভেসে বেড়ানো এর ক্ষুদ্র কণা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে প্রবেশ করে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই এ বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে হবে।
চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, গবাদিপশুর ক্ষেত্রেও পার্থেনিয়াম মারাত্মক ক্ষতিকর। এই আগাছা খেলে পশুর হজমে সমস্যা, জ্বর, দুর্বলতা ও বিভিন্ন রোগ দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে দুগ্ধবতী গাভির জন্য এটি ঝুঁকিপূর্ণ।
চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ফারুক হোসেন বলেন, গাছটির পাতা, ফুল ও বীজ বিষাক্ত। বাতাসের মাধ্যমে এর বীজ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। একই সঙ্গে এর পরাগ মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সময়মতো নিয়ন্ত্রণ না করলে এটি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাসুদুর রহমান সরকার বলেন, পার্থেনিয়ামকে বিষাক্ত আগাছা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে কৃষি মন্ত্রণালয় অবগত রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পার্থেনিয়াম মাটির পুষ্টি উপাদান শোষণ করে এবং আশপাশের উদ্ভিদের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করে। গবেষণায় দেখা গেছে, এটি বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে আম বাগান, আখ, কলা, হলুদ, করলা, শিম ও সবজি ক্ষেতে এর প্রভাব বেশি দেখা যায়। তাই কৃষকদের সচেতন করা এবং আগাছা দমনে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সচেতন মহল ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ- ফুল ও বীজ ধরার আগেই পার্থেনিয়াম গাছ উপড়ে ফেলে নিরাপদে ধ্বংস করতে হবে। আগাছা পরিষ্কারের সময় গ্লাভস, মাস্ক ও সুরক্ষামূলক পোশাক ব্যবহার করা উচিত। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, কৃষি বিভাগ ও পরিবেশ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
সবুজে ঘেরা এই আগাছা দেখতে যতই নিরীহ হোক না কেন, এর বিস্তার অব্যাহত থাকলে কৃষি, পরিবেশ, গবাদিপশু এবং মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর ভয়াবহ প্রভাব পড়তে পারে। তাই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
পিএনএস/এমএইউ
ছড়িয়ে পড়ছে বিষাক্ত আগাছা পার্থেনিয়াম, ঝুঁকিতে মানুষ-ফসল-পশু
01-06-2026 05:05PM

