কৌতূহল জাগানো বাজেট ব্রিফকেসের রহস্য কথা, জেনে নিন

  11-06-2026 02:15PM


পিএনএস ডেস্ক: বাজেট ঘোষণার দিন এলেই দেশের টেলিভিশন পর্দা কিংবা সংবাদপত্রের পাতায় একটি দৃশ্য চিরচেনা—সাংবাদিকদের ক্যামেরার ফ্ল্যাশ আর কৌতূহলী জনতার চোখের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী। তবে সবার নজর থাকে তাঁর হাতের একটি নির্দিষ্ট বস্তুর দিকে; সেটি হলো- একটি ব্রিফকেস।

অনেকের মনেই অবান্তর প্রশ্ন জাগে, এই ব্রিফকেসের ভেতর কি লাখ লাখ কোটি টাকা পোরা থাকে? বাস্তবে কোটি কোটি টাকার নোট ট্রাকে করে আনলেও ধরবে না। মূলত এই ব্রিফকেসে থাকে দেশের আগামী এক বছরের আয়-ব্যয়ের খতিয়ান আর অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা। কিন্তু এই ব্রিফকেস বহন করার ঐতিহ্য এলো কোথা থেকে? এর পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ ও আকর্ষণীয় ইতিহাস।

‘বাজেট’ যখন ছিল চামড়ার থলি

‘বাজেট’ শব্দটি মূলত এসেছে প্রাচীন ফরাসি শব্দ ‘ব্যুজেট’ (Bougette) থেকে, যার শাব্দিক অর্থ হলো ‘চামড়ার থলি’ বা ‘মানিব্যাগ’। বাংলা একাডেমির ‘বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান’ অনুযায়ী, ১৯০২ সালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখায় প্রথম এই শব্দটি বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত হয়।

আধুনিক বাজেট ব্যবস্থার প্রবর্তক ধরা হয় স্যার রবার্ট ওয়ালপুলকে, যিনি ১৭২৫ থেকে ১৭৪২ সাল পর্যন্ত ব্রিটেনের অর্থমন্ত্রী (চ্যান্সেলর অব দি এক্সচেকার) ছিলেন। বাজেট তৈরির আগে কর বাড়ানো বা কমানো নিয়ে বিভিন্ন মহলের চিরকুট ও পরামর্শ তিনি তাঁর চামড়ার থলিতে জমিয়ে রাখতেন। পরবর্তীতে বছর শেষে সেই থলি খুলে তিনি হিসাব-নিকাশ করতেন। সেই থলি থেকেই আজকের ‘বাজেট ব্রিফকেস’-এর ধারণার উৎপত্তি।

১৮৬০ সালে ব্রিটেনের বাজেটপ্রধান উইলিয়াম ই. গ্ল্যাডস্টোন সোনা দিয়ে রানির মুখের আদল খোদাই করা একটি বিশেষ লাল স্যুটকেসে করে বাজেটের নথি নিয়ে আসেন। সেই ঐতিহাসিক স্যুটকেসটি বহু বছর ধরে ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রীরা ব্যবহার করেছেন।

লাল, কালো নাকি মেরুন?

এই উপমহাদেশে প্রথম বাজেট পেশ করা হয় ১৮৬০ সালের ৭ এপ্রিল। ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে জেমস উইলসন কলকাতায় সেই বাজেট উপস্থাপন করেন। ১৯৭১-৭২ ও ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের হাত ধরে এই ব্রিফকেসের ঐতিহ্য এ দেশে প্রবেশ করে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ১২ বার করে বাজেট পেশ করেছেন সাবেক দুই অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান এবং আবুল মাল আবদুল মুহিত। প্রথা অনুযায়ী এই ব্রিফকেস ‘লাল’ রঙের হওয়ার কথা থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অর্থমন্ত্রীরা ফ্যাশন সচেতন হয়ে উঠেছেন। প্রয়াত আবুল মাল আবদুল মুহিতকে প্রায়শই মেরুন বা কালো রঙের ব্রিফকেস হাতে সংসদে প্রবেশ করতে দেখা যেত।

মূল মন্ত্র যেখানে ‘গোপনীয়তা’

বাজেট ব্রিফকেসের প্রধান অনুষঙ্গ হলো গোপনীয়তা। বাজেটে কোন পণ্যের দাম কমবে বা বাড়বে, তা আগেভাগে প্রকাশ পেলে ব্যবসায়ীরা রাতারাতি মজুতদারি শুরু করতে পারেন। ফলে এই রাষ্ট্রীয় তথ্য গোপন রাখা অর্থমন্ত্রীর অন্যতম প্রধান নৈতিক দায়িত্ব।

ইতিহাসে এই গোপনীয়তা ভঙ্গের একটি বড় খেসারতের গল্প রয়েছে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটেনের অর্থমন্ত্রী হিউ ডাল্টন পার্লামেন্টে ঢোকার মুখে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে অসাবধানতাবশত কর ব্যবস্থার কিছু তথ্য ফাঁস করে দেন। মুহূর্তের মধ্যে সেই খবর পত্রিকায় বিশেষ সংখ্যা হিসেবে ছাপা হয়ে সংসদ সদস্যদের হাতে চলে আসে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই তথ্য ফাঁসের দায়ে তীব্র সমালোচনার মুখে ডাল্টন পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

ঐতিহ্যের ভাঙাগড়া ও ডিজিটাল রূপান্তর

১৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এই ঔপনিবেশিক ঐতিহ্য প্রথম ভেঙে দেন ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন। ২০১৯ সালে তিনি ব্রিফকেস বর্জন করে লাল কাপড়ে মোড়ানো ঐতিহ্যবাহী হিসাবের খাতা বা ‘বহি-খাতা’ নিয়ে সংসদে আসেন। এর দুই বছর পর, ২০২১ সালে তিনি কাগজের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করে লাল মোড়কে ঢাকা একটি ‘ট্যাবলেট’ বা ট্যাব নিয়ে সংসদে ঢোকেন এবং ডিজিটাল বাজেট পেশ করেন।

বিশ্বজুড়ে ট্যাবলেট বা ল্যাপটপের ব্যবহার বাড়লেও আমাদের দেশে অর্থমন্ত্রীদের ব্রিফকেস হাতে পোজ দেওয়ার দৃশ্যটির আবেদন এখনো কমেনি। যদিও আধুনিক বাজেট এখন সম্পূর্ণ ডিজিটালি প্রস্তুত হয়, তবুও এই ব্রিফকেসটি আজ অবধি জবাবদিহিতা ও রাষ্ট্রীয় আর্থিক পরিকল্পনার এক অনন্য প্রতীক হিসেবে টিকে রয়েছে।


পিএনএস/এমএইউ


@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন