সৃজনশীল শিক্ষা সম্পর্কে কিছু কথা

  28-09-2016 08:41PM

পিএনএস: বৃটিশ আমলে এদেশে নোটনির্ভর ও মুখস্থনির্ভর শিক্ষা পদ্ধতি চালু হয়েছিল। শিক্ষার্থীরা নোট মুখস্ত করে পরীক্ষা দিত। পরীক্ষার আগে সাজেশন ও ভালো নোট যোগাড় করে নিতেন শিক্ষার্থীরা। ভালোনোট খাতায় হুবহু লিখতে পারলে ভালো নম্বর উঠত। হাতের লেখা সুন্দর হলে তো কথাই নেই। মুখস্থ করার ক্ষমতা যার যত বেশি থাকতো সে তত বেশি ভালো করত।
গেল বছর যে প্রশ্ন পরীক্ষায় এসেছে পরবর্তী বছর তা আসত না। আর শিক্ষার্থীরা নির্ভরশীল হয়ে পড়তো গাইড-নোট বই এবং প্রাইভেট পড়ার প্রতি। ফলে মুখস্থনির্ভর শিক্ষা পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা নকল করার দিকে মনোনিবেশ করত। পরীক্ষার ২-৩ মাস আগে সাজেশন নিয়ে লেখাপড়ায় মন বসাতো শিক্ষার্থীরা। পুরো বই না পড়েও ভালো করতে পারতো।
এই মুখস্থসর্বস্ব শিক্ষা পদ্ধতির পিছনে কাজ করেছে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা। যে শিক্ষা ব্যবস্থায় ছিল না শিক্ষার কোন লক্ষ্য। ছিল না সৃজনশীলতা, জ্ঞানী ও দক্ষ জনসম্পদ তৈরির কোন ব্যবস্থার কথা। এ অবস্থায় শিক্ষাকে যুগোপযোগী ও বাস্তবমুখী করার জন্য প্রণীত হয় জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০।
শিক্ষানীতিতে বলা হয়েছে, মুখস্থ কোন বিদ্যা নয়। প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতি অর্থাৎ মুখস্থ বিদ্যায় প্রকৃত মূল্যায়ন হয় না। বিষয়বস্তুকে আয়ত্তে এনে তা মূল্যায়ন করতে পারলেই প্রকৃত মূল্যায়ন হয়। তাই দেশে শিক্ষার প্রকৃত মূল্যায়নের জন্য চালু হয়েছে সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি।
সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতিতে শিক্ষার প্রকৃত মূল্যায়নের কথা রয়েছে। জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ এর আলোকে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করা হয়েছে।
বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্র পরিণতকরণে এ শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হয়।
শিক্ষানীতির আলোকে জীবনের চাহিদা পূরণে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষে ষষ্ঠ-দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাক্রম নবায়ন, পরিমার্জন ও উন্নয়ন করা হয়। এ শিক্ষানীতির সাথে মিল রেখে পরিবর্তন আসে শিক্ষাক্রমে।
জাতীয় শিক্ষাক্রম -২০১২ এ সাময়িক ও পাবলিক পরীক্ষায় দক্ষতাভিত্তিক বহুনির্বাচনী (এমসিকিউ) ও সৃজনশীল (সিকিউ) প্রশ্নে পরীক্ষা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ফলে ২০১০ সালে মাধ্যমিক স্তরে, ২০১১ সালে দাখিলে ও ২০১২ সালে এইচএসসি পর্যায়ে দক্ষতাভিত্তিক সৃজনশীল পদ্ধতির কার্যক্রম শুর” হয়।
এ পদ্ধতি চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিরকালের জন্য বিদায় হল মুখস্থসর্বস্ব শিক্ষা পদ্ধতি। বাস্তবায়ন হতে লাগল বুদ্ধিনির্ভর, চিন্তানির্ভর ও মননশীল সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতি। যে পদ্ধতিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়কে ডুবে থাকতে হবে শিখন-শেখানো কার্যক্রমে।
সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতিতে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে দুই প্রকারের দক্ষতাভিত্তিক প্রশ্ন করা হয়। একটি হচ্ছে বহুনির্বাচনী (এমসিকিউ) প্রশ্ন এবং অপরটি হচ্ছে সৃজনশীল (সিকিউ) প্রশ্ন। সৃজনশীল প্রশ্নপত্র প্রণয়নের ক্ষেত্রে চারটি চিন্তন দক্ষতা স্তরে বিন্যাস করা হয়েছে। বিন্যাসের লক্ষ্য হচ্ছে সবল ও দূর্বল শিক্ষার্থীদের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করা।
স্তরগুলো হচ্ছে জ্ঞানস্তর, অনুধাবনস্তর, প্রয়োগস্তর ও উচ্চতর চিন্তন দক্ষতা। চিন্তন দক্ষতা এ চারটি স্তর কাঠিন্যের ক্রমানুসারে বিন্যস্ত করা হয়েছে।
কাঠিন্যের স্তর নির্ণয়ের ক্ষেত্রে চিন্তার গভীরতা/ বহুমাত্রিকতা, সময় ও সিঁড়ি (স্টেপ) বিবেচনার উপর জোর দেয়া হয়েছে। কাঠিন্যের স্তরগুলো হচ্ছে সহজ, মধ্যম ও কঠিন। সহজ স্তরে একজন শিক্ষার্থী বহুনির্বাচনী প্রশ্নের ক্ষেত্রে একটি প্রশ্নের উত্তর ১০-৪০ সেকেন্ড এবং সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর ১-৩ মিনিটের মধ্যে দিতে হবে।
মধ্যম স্তরে বহুনির্বাচনীর ক্ষেত্রে ৪০-৬০ সেকেন্ড এবং সৃজনশীলের ক্ষেত্রে ৬-৮ মিনিটের মধ্যে এবং কঠিন স্তরে বহুনির্বাচনীর ক্ষেত্রে ৬০-৯০ সেকেন্ড ও সৃজনশীলের ক্ষেত্রে ৯-১১ মিনিট সময়ের মধ্যে উত্তর দিতে হবে।
অপরদিকে মানসম্মত এমসিকিউ প্রশ্ন প্রণয়নের ক্ষেত্রে নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। যেমন, সাধারণ বহুনির্বাচনী, বহুপদী সমাপ্তিসূচক বহুনির্বাচনী এবং অভিন্ন তথ্যভিত্তিক বহুনির্বাচনী প্রশ্ন। এসব ক্ষেত্রে প্রশ্নের উদ্দীপক তৈরি করতে হবে বিষয়বস্তুর উপর ভিত্তি করে।
যতদুর সম্ভব উদ্দীপক ৬/৭ বাক্যের মধ্যে হতে হবে। বহুনির্বাচনী প্রশ্নের ক্ষেত্রে সহজস্তর ৩০ শতাংশ, মধ্যম স্তর ৫০ শতাংশ এবং কঠিন স্তর ২০ শতাংশ হতে হবে। সৃজনশীল প্রশ্ন পত্র প্রণয়ের ক্ষেত্রে কাঠিন্যের ক্রমানুসারে সহজ, মধ্যম ও কঠিন এই তিন স্তরে সাজাতে হবে।
শিক্ষাক্রমের সাথে মিল রেখে সৃজনশীল প্রশ্নে উদ্দীপক দিতে হবে। বই থেকে হুবহু কোন প্রশ্ন করা যাবে না। শিখনফলের আলোকে প্রশ্ন প্রণয়ন করতে হবে।
বুদ্ধিনির্ভর ও চিন্তানির্ভর সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতি সরকারের একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এ পদ্ধতি চালু হওয়ার সাথে সাথে অবসান হল মুখস্থনির্ভর শিক্ষা পদ্ধতি।
কেননা প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় অর্থাৎ মুখস্থ নির্ভর শিক্ষা পদ্ধতিতে শ্রেণিকক্ষে শিখন-শেখানো কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকে পাঠ্যপুস্তক মুখস্থ করার মধ্যে। এতে শিক্ষার্থীরা বাজারের নোট বই, গাইড বই, প্রাইভেট টিউশন, কোচিং সেন্টার ইত্যাদির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা অসদুপায় অবলম্বনে উৎসাহী হয়ে ওঠে। সামাজিক ও জাতীয় জীবনে রাখতে পারে না কোন ভূমিকা।
মুখস্থনির্ভর শিক্ষাপদ্ধতিতে প্রতি বছর এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ ফেল করে। সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়ে পাঠ্য বইয়ের দিকে মনোনিবেশ থাকায় ফেল করে কম। সৃজনশীল পদ্ধতিতে শিখন-শেখানো ও মূল্যায়নের প্রতি গুরুত্ব বেড়ে যায়। পরীক্ষার জন্য অমুক প্রশ্নটি কমন সেটি বলার আর সুযোগ থাকে না। বেড়ে যায় শিখনফল মূল্যায়নের যথার্থতা ও নির্ভরযোগ্যতার মাপকাঠি।
সৃজনশীল পদ্ধতির সাথে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়ানো জন্য বিশেষ করে সচেতনতা, শোনার প্রতি আগ্রহ, সক্রিয় অংশগ্রহণ, আত্মনির্ভরশীলতা, চিন্তা করার ক্ষমতা, অনুশীলন, শ্রেণিকক্ষে শিখন-শেখানো প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন এবং অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন পরীক্ষায় সৃজনশীল প্রশ্নের ব্যবহার জোরদার করতে হবে।
শ্রেণিকক্ষে শিখন-শেখানো কার্যক্রমের জন্য কিছু পদ্ধতি গ্রহণ করা যেতে পারে। এই পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিখন আনন্দদায়ক ও অংশগ্রহণমূলক হতে পারে। শিখন-শেখানো প্রক্রিয়ায় ত্রুটি থাকলে শিক্ষার্থীদের শিখন কাঙ্ক্ষিত-প্রত্যাশিত পর্যায়ে উন্নীত হয় না।
তাই শ্রেণিকক্ষে শিখন-শেখানোর কৌশলই নির্ভর করে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল শিক্ষার উন্নয়ন। নিন্মে কয়েকটি শিখন-শেখানো পদ্ধতি আলোচনা করা হল।
(১) প্রশ্ন-উত্তর পদ্ধতি: এটি শিখন-শেখানোর জন্য খুবই কার্যকর পদ্ধতি। শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে ফিডব্যাক পেতে এ পদ্ধতিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
(২) মাথা খাটানো পদ্ধতি : এ পদ্ধতিতে শিক্ষক- শিক্ষার্থী উভয়ের মধ্যে চিন্তা- ভাবনা করার ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়। অজানাকে জানার এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখে।
(৩) অভিজ্ঞতা পদ্ধতি : বেশি বেশি অনুশীলন করলে হয় অভিজ্ঞতা। আর অভিজ্ঞতার মাধ্যমে হয় শিখন। এ পদ্ধতিতে বিভিন্ন মানের শিক্ষার্থীদের নিয়ে ছোট-ছোট দল গঠন করা হয়। দলের ভিতর সদস্যদের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে শিখন হয়। এ পদ্ধতিতে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীরা লাভবান হয়।
(৪) প্রদর্শন পদ্ধতি: বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করে এ পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। বিশেষ করে পোস্টার, চার্ট ও বোর্ড প্রয়োগ করা যেতে পারে। এ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের বেশি করে শিখন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ পায়।
একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, শিখন-শেখানো কার্যক্রমে শিক্ষকদেকে কম সময় দিতে হবে। শিক্ষার্থীদেকের কাজ করার বেশি সময় দিতে হবে। তাহলে শিখন ফল অর্জন ফলপ্রসূ হবে।
পরিশেষে বলা প্রয়োজন শিক্ষাকে যুগোপযোগী ও বাস্তবমূখী করার জন্য সৃজনশীল পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বুদ্ধিনির্ভর এ শিক্ষাপদ্ধতি বাস্তবায়নের জন্য এগিয়ে আসতে হবে সকল সচেতন মহলকে।
এক্ষেত্রে শিক্ষা প্রশাসন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। দেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ইন-হাউজ প্রশিক্ষণ, শিখন-শেখানো, অভ্যন্তরীণ প্রতিটি পরীক্ষায় সৃজনশীল প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, পরিশোধন ও উত্তরপত্র মূল্যায়ন কার্যক্রম নিয়মিত করতে হবে।
সকল শিক্ষককে সৃজনশীল শিক্ষক প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে। তাহলে সরকারের দিনবদলের অঙ্গিকার পূরণ এবং ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করণে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে সক্ষম হবে।
কবিতার লাইনে বলতে চাই
মুখস্থনির্ভর শিক্ষাপদ্ধতির দিন শেষ, বাস্তবায়ন করতে হবে বুদ্ধিনির্ভর সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতির বাংলাদেশ।
তথ্যসূত্র: (১) জাতীয় শিক্ষানীতি – ২০১০
(২) শিক্ষক প্রশিক্ষণ ম্যনুয়্যাল নভেম্বর- ২০১৫
(৩) জাতীয় শিক্ষাক্রম – ২০১২
লেখক: মাস্টার ট্রেইনার সৃজনশীল শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও সহযোগী অধ্যাপক
আলহাজ্ব মোস্তফিজুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, লোহাগাড়া, চট্টগ্রাম।

পিএনএস/মো: শ্যামল ইসলাম রাসেল

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন