প্রেমের টানে ধর্মান্তরিত: ভারতে গ্রেপ্তারের পর এলোমেলো বাংলাদেশি কাজলের জীবন!

  28-06-2026 03:24PM

পিএনএস ডেস্ক: প্রেমের কাছে ধর্ম, ভাষা কিংবা দেশের সীমানা অনেক সময়ই হার মানে। কিন্তু বাস্তবতা সবসময় প্রেমের পক্ষে দাঁড়ায় না। বাংলাদেশি তরুণী কাজল এবং ভারতের গুজরাটের বাসিন্দা তরুণ প্যাটেলের জীবন যেন সেই নির্মম বাস্তবতারই এক প্রতিচ্ছবি।

ভালোবাসার টানে দেশ ছেড়েছিলেন কাজল, বদলেছিলেন ধর্ম, গড়েছিলেন নতুন সংসার। কিন্তু এক ফোন কলই আজ তাদের সাজানো জীবনকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

২ জুন, ২০২৬ পর্যন্ত সবকিছুই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু সেদিন একটি ফোন কল তাদের জীবনে ঝড় বয়ে আনে। পরিবার থেকে দূরে থাকা কাজল স্বামীর ফোনে মায়ের সঙ্গে কথা বলেন। মায়ের স্বাস্থ্যের খোঁজ খবর নেন, কারণ সম্প্রতি তার মায়ের একটি অস্ত্রোপচার হয়েছে।

কাজলের স্বামী তরুণ প্যাটেল মনে করছেন, ওই ফোন কলই প্রশাসনের নজরে আসে। এরপরে পুলিশ তাদের বাড়িতে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। ফোনে বাংলাদেশি নম্বর থাকার বিষয়টি স্বীকার করার পরই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। কাজলের কাছে বৈধ পাসপোর্ট এবং ভারতের প্রবেশের কোনো নথি না থাকায় তার জায়গা হয় নারী সুরক্ষা কেন্দ্রে।

ফেসবুকের বন্ধুত্ব থেকে আজীবনের সম্পর্ক

এই গল্পের শুরু ২০১২ সালে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পরিচয় হয়েছিল বাংলাদেশের গোপালপুরের তরুণী কাজুলি (পূর্বের নাম)এবং গুজরাটের তরুণ প্যাটেলের।অনলাইন পরিচয় ধীরে ধীরে পরিণত হয় গভীর সম্পর্কে। একসময় তারা বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। তরুণ চেয়েছিলেন কাজুলি বৈধ পাসপোর্ট তৈরি করে ভারতে আসুন। কিন্তু পারিবারিক বাধা সামনে আসে।


তরুণের ভাষ্য অনুযায়ী, কাজুলির পরিবার তাকে অন্য একজন বাংলাদেশি পুরুষের সঙ্গে বিয়ে দিতে চেয়েছিল। পাসপোর্ট তৈরির চেষ্টাও ব্যর্থ হয়। এক দালালের কাছে টাকা দিয়েও প্রতারণার শিকার হন তিনি। শেষ পর্যন্ত পরিবার ছেড়ে পালিয়ে কলকাতা হয়ে গুজরাটে পৌঁছান কাজুলি। সেখানে মালা বদলের মাধ্যমে বিয়ে করেন দুজন। এরপর কাজুলি নিজের নাম পরিবর্তন করে ‘কাজল’ রাখেন। স্বামীর দাবি, বিয়ের পর তিনি ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে হিন্দুধর্ম গ্রহণ করেন। তবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় তাদের বিয়ে কখনো আইনগত স্বীকৃতি পায়নি।

সন্তানদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে ঘর

কাজল ও তরুণের সংসারে রয়েছে দুই সন্তান। মায়ের অনুপস্থিতিতে এখন তাদের দিন কাটছে কান্নায়। তরুণ বলেন, প্রতিদিন সন্তানরা জানতে চায়—‘মা কবে বাড়ি ফিরবে?’ কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর তার জানা নেই। শুধু সন্তানরাই নয়, পুরো পরিবারই এখন মানসিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কাজলের শাশুড়ি ইন্দুবেন বলেন, কাজল তাদের কাছে শুধু পুত্রবধূ ছিলেন না; ছিলেন নিজের মেয়ের মতো।

তার কথায়, ‘‘কাজল চলে যাওয়ার পর আমাদের পরিবারে কেউ স্বাভাবিকভাবে খাওয়া-দাওয়া করতে পারছে না। বাচ্চারা সারাক্ষণ মায়ের জন্য কাঁদছে।’’

নারী সুরক্ষা কেন্দ্রে দিন কাটছে

বর্তমানে কাজলকে রাখা হয়েছে ‘জাগ্রুতি মহিলা সংগঠন’ পরিচালিত একটি হোমে। সংগঠনের সভানেত্রী আশা দালালের ভাষ্য, কাজল প্রায়ই কান্নাকাটি করেন এবং সবসময় সন্তানদের কথা ভাবেন। সবচেয়ে বড় ভয়—যদি তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়, তাহলে হয়তো আর কখনোই স্বামী-সন্তানদের কাছে ফিরে আসতে পারবেন না। বিশেষ অনুমতি নিয়ে মাঝে মধ্যে দূর থেকে সন্তানদের দেখার সুযোগ দেওয়া হলে কিছুটা স্বস্তি পান তিনি। কিন্তু অনিশ্চয়তার ভার তাকে প্রতিনিয়ত কষ্ট দিচ্ছে।

আদালতের দ্বারস্থ স্বামী

স্ত্রীকে দেশে ফেরত পাঠানো ঠেকাতে আইনি লড়াই শুরু করেছেন তরুণ প্যাটেল। তিনি গুজরাট হাইকোর্টের শরণাপন্ন হয়েছেন। তার আইনজীবী জয়নব সাইয়েদের মতে, দীর্ঘদিন ভারতে বসবাস এবং ভারতীয় নাগরিককে বিয়ে করার বিষয়টি আদালতে গুরুত্ব পেতে পারে। সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে ব্যক্তির জীবন ও স্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে, যা কেবল নাগরিকদের জন্য সীমাবদ্ধ নয়। তবে শেষ পর্যন্ত আদালত কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই নির্ধারণ করবে কাজলের ভবিষ্যৎ।

সূত্র: বিবিসি


পিএনএস/এমএইউ

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন