ইউরোপের কয়েকটি দেশে হামলা চালাতে পারে রাশিয়া

  27-06-2026 12:19AM

পিএনএস ডেস্ক: পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর পূর্ব ব্লকের দুটি দেশ সতর্কবার্তা দিয়েছে যে, বাল্টিক রাষ্ট্রগুলোতে বা পোল্যান্ডে একটি সম্ভাব্য ‘উসকানি’ বা হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে রাশিয়া। ইউক্রেনের দূরপাল্লার ধারাবাহিক হামলায় মস্কো ও সেন্ট পিটার্সবার্গের মতো প্রধান শহরগুলো লক্ষ্যবস্তু হওয়ায় ক্রেমলিন এখন চরম চাপে রয়েছে। আর এই চাপ থেকেই ন্যাটোর সীমানায় এমন বিপদের আশঙ্কা করছেন পশ্চিমা গোয়েন্দারা।

সোমবার (২২ জুন) লাটভিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছে, আমরা কিছু লক্ষণ দেখছি যে, পোল্যান্ড বা বাল্টিক দেশগুলোর বিরুদ্ধে সামরিক উসকানির প্রস্তুতি নিচ্ছে রাশিয়া। তবে এটি কোনো পূর্ণাঙ্গ বা বড় আকারের আক্রমণ হবে না। গত সপ্তাহে ন্যাটোর অন্য একটি সদস্য দেশের একজন উচ্চপদস্থ রাজনৈতিক সূত্রও একই ধরণের গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার কথা নিশ্চিত করে জানান, ভ্লাদিমির পুতিন বাল্টিক রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে কিছু একটা করার পরিকল্পনা করছেন।

সূত্রগুলোর মতে, ইউক্রেন আক্রমণ নিয়ে রাশিয়া যখন বেশ সংকটে রয়েছে, তখন পুতিন হয়তো একটি মরিয়া জুয়া খেলতে চাইছেন। তিনি দেখতে চান, ন্যাটোর সবচেয়ে ছোট তিন সদস্য দেশ- এস্তোনিয়া, লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়ার সুরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত এগিয়ে আসে কি না।

বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) রাতে পোল্যান্ডের গদানস্ক শহরে অনুষ্ঠিত ‘ইস্টার্ন ফ্ল্যাঙ্ক’ শীর্ষ সম্মেলন শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্কও নিজের উদ্বেগের কথা প্রকাশ্যে জানান। তিনি বলেন, পরিস্থিতি যে অত্যন্ত অস্থিতিশীল এবং আগামী সপ্তাহ ও মাসগুলোতে বিভিন্ন ধরণের উত্তেজনা দেখা দিতে পারে, এই বিষয়ে আমরা সবাই একমত। যারা সরাসরি এই ঝুঁকির মুখে রয়েছে, তারা একটি জোট হিসেবে এর প্রস্তুতি নিতে চায়।

লাটভিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা আরও জানিয়েছে, রাশিয়ার পক্ষে এখন নতুন কোনো পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধক্ষেত্র বা দ্বিতীয় ফ্রন্ট খোলার সক্ষমতা নেই। তাই তারা হাইব্রিড হামলা, যেমন—মিসাইল, ড্রোন বা অন্য কোনো উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের কথা ভাবছে, যাতে একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া যায়: ইউক্রেনকে সমর্থন করা বন্ধ কর, না হলে তোমাদের নিজেদেরই সমস্যায় পড়তে হবে।

অবশ্য ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসনের আগে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (CIA) বা ব্রিটিশ সংস্থা এমআইসিক্স (MI6) যেভাবে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়েছিল, এবারের সতর্কবার্তায় তেমন বিস্তারিত কোনো তথ্য মেলেনি। তবে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার অগ্রযাত্রা থমকে যাওয়ার এই সময়েই এমন খবর এলো।

চ্যাথাম হাউজের রাশিয়া বিশেষজ্ঞ কেয়ার জাইলস বলেন, রাশিয়া এই অচলাবস্থা ভাঙতে সংঘাতকে অন্য দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার (হরাইজন্টাল এস্কেলেশন) পথ খুঁজবে। রাশিয়া যে চুপচাপ হেরে যাবে, তা ভাবা ঠিক হবে না।

চলতি সপ্তাহে রাশিয়ার আপেক্ষিক দুর্বলতার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়, যখন বেলারুশে থাকা রাশিয়ার ড্রোন রিলে স্টেশনগুলোর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি শুক্রবার (১৯ জুন) বেলারুশকে এক সপ্তাহের আলটিমেটাম দিয়ে জানিয়েছিলেন যে, ওইসব সরঞ্জাম ব্যবহার করে ইউক্রেনে রুশ হামলা চালানো হচ্ছে। এরপরই একটি টেলিগ্রাম চ্যানেলে জানা যায়, বেলারুশের ব্রেস্ট ও গোমেল অঞ্চলের কর্তৃপক্ষ মোবাইল অপারেটরদের ওইসব সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেয়। তবে কারণ হিসেবে তারা দেখায় যে, এগুলো বুনো পাখির (গ্রাউস) বাসা বাঁধার জায়গায় বিঘ্ন ঘটাচ্ছে।

এমন এক সময়ে এই উত্তেজনা ছড়াচ্ছে, যখন ন্যাটোর বার্ষিক সম্মেলন তুরস্কের আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ও জোটে মার্কিন প্রতিশ্রুতি নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বুধবার (২৩ জুন) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ইউরোপের দেশগুলো তাদের বিমানঘাঁটি ব্যবহার করে মার্কিন বিমান বাহিনীকে ইরানে বোমা হামলার অনুমতি না দেওয়ায় তিনি হতাশ।

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইউরোপজুড়ে রাশিয়ার অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডের বেশ কিছু নজির দেখা গেছে। যেমন- ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে যুক্তরাজ্য, পোল্যান্ড ও জার্মানিতে ডিএইচএল পার্সেলের ভেতরে দূরনিয়ন্ত্রিত অগ্নিবোমা পাতার ঘটনা ঘটেছিল। এছাড়া গত সেপ্টেম্বরে ১৯টি রাশিয়ান ডেকয় ড্রোন পোল্যান্ডের আকাশসীমায় ঢুকে পড়লে ন্যাটো ফাইটার জেট পাঠাতে বাধ্য হয় ও তিনটি পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের মানুষকে ঘরের ভেতরে আশ্রয় নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

বর্তমানে ইউক্রেন নিজস্ব প্রযুক্তিতে রাশিয়ার ২ হাজার কিলোমিটার ভেতরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা অর্জন করেছে। গত সপ্তাহে প্রায় ২০০টি ড্রোন মস্কোর বিভিন্ন স্থানে আঘাত হানে ও একটি শোধনাগারে হামলার পর রাশিয়ার রাজধানীর কিছু অংশে কালো তেলের বৃষ্টি হয়।

একজন পশ্চিমা সামরিক কর্মকর্তা বলেন, যুদ্ধ যখন মস্কো ও সেন্ট পিটার্সবার্গের আকাশে চলে গেছে, তখন চাপে পড়ে পুতিন যেকোনো সময় মরিয়া হয়ে বাইরে আঘাত করতে পারেন। তিনি স্পষ্ট করেই বলেন, লুকিয়ে লাভ নেই, এটি সত্যিই একটি বিপজ্জনক সময়।

এর আগে ২০২২ সালের শরতেও যখন ইউক্রেনের খারকিভ অঞ্চলে রুশ বাহিনী আকস্মিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল, তখন রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তেমন কোনো পদক্ষেপের প্রমাণ মেলেনি ও বছরের শেষের দিকে যুদ্ধক্ষেত্র কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছিল। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান


পিএনএস/রাআ

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন