সবুজ গরুর মাংসের রহস্য, বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিলেন বাকৃবির অধ্যাপক

  25-07-2026 05:53PM

পিএনএস ডেস্ক : সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া রান্নার সময় মাংস সবুজ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। খুলনার পাইকগাছার পিকনিকের সেই ছবি ও ভিডিও ঘিরে নানা ধরনের ব্যাখ্যা ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে, পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে বা গুজবে কান না দিতে পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) খাদ্য নিরাপত্তা, অণুজীববিজ্ঞান ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড হাইজিন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোছা. মিনারা খাতুন বলেন, ‘রান্নার পর মাংসের কোনো অংশ সবুজাভ হয়ে গেলেও ঝোলের রং স্বাভাবিক থাকলে, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। তবে, শুধু ছবি বা ভিডিও দেখে এর কারণ নির্ধারণ করা বৈজ্ঞানিকভাবে সম্ভব নয়। প্রকৃত কারণ জানতে মাইক্রোবায়োলজিক্যাল ও রাসায়নিক পরীক্ষা অপরিহার্য।’

তিনি বলেন, ‘মাংসের রং নির্ধারণকারী রঞ্জক পদার্থ মায়োগ্লোবিন বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ার কারণে সবুজাভ বর্ণ ধারণ করতে পারে। আবার সিউডোমোনাস প্রজাতির কিছু ব্যাকটেরিয়া কিংবা অন্যান্য অণুজীবের বৃদ্ধির ফলে এমন পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। এছাড়া অনুপযুক্ত তাপমাত্রায় সংরক্ষণ, দীর্ঘ সময় ফ্রিজে রাখা, অক্সিডেশন, রান্নার সময় ধাতব পাত্রের সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়া কিংবা জবাই পরবর্তী সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যবস্থার ত্রুটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে।’

অধ্যাপক মিনারা খাতুন বলেন, ‘শুধু একদিন ফ্রিজে রাখার কারণে সাধারণত গরুর মাংস সবুজ হয়ে যায় না। সঠিকভাবে শূন্য থেকে চার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যে সংরক্ষণ করা হলে মাংসের রং কিছুটা গাঢ় বা বাদামি হতে পারে, তবে স্পষ্ট সবুজ হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক নয়।’

মাংস সবুজ হলেও ঝোলের রং স্বাভাবিক থাকার বিষয়টি নিয়েও ব্যাখ্যা দেন তিনি। তার ভাষ্য, ঝোলের রং মূলত মাংসের রঞ্জক পদার্থ, মসলা এবং রান্নার সময় সংঘটিত বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে। ফলে, মাংসের নির্দিষ্ট অংশে পরিবর্তন ঘটলেও পুরো ঝোলের রং অপরিবর্তিত থাকতে পারে। তাই ঝোলের রং স্বাভাবিক থাকলেই মাংস নিরাপদ, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।

মাংস বিক্রেতার দাবি, একই গরুর মাংস কিনে অন্যরা কোনো সমস্যায় পড়েননি।

এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক মিনারা খাতুন বলেন, ‘একই পশুর বিভিন্ন অংশের সংরক্ষণ পরিবেশ, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও দূষণের মাত্রা ভিন্ন হতে পারে, ফলে সব অংশে একই রকম পরিবর্তন নাও ঘটতে পারে। তাই অন্যদের কিছু হয়নি এই যুক্তি খাদ্য নিরাপত্তার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। একইসঙ্গে বেকারির কোনো রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শে মাংস সবুজ হয়ে যাওয়ার যে জল্পনা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়েছে, তারও এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। কেননা, খাদ্য শিল্পে ব্যবহৃত বেশিরভাগ রাসায়নিক সাধারণত তাপের সংস্পর্শে এসে মাংসকে সবুজ করে না।’

তিনি জানান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মাংস, হ্যাম ও সসেজে সবুজাভ বর্ণের ঘটনা বৈজ্ঞানিক গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে মায়োগ্লোবিনের রাসায়নিক পরিবর্তন, অণুজীব ( ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক) বৃদ্ধি, অক্সিডেশন, আলোর প্রতিফলনজনিত ইরিডেসেন্স কিংবা সংরক্ষণ ও পরিবহনের ত্রুটি সম্ভাব্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তবে, প্রতিটি ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে পরীক্ষাগারে নমুনা পরীক্ষা করাই একমাত্র নির্ভরযোগ্য উপায়।

ভোক্তাদের উদ্দেশে এই অধ্যাপক বলেন, ‘মাংসে অস্বাভাবিক সবুজ রং, দুর্গন্ধ, পিচ্ছিল ভাব বা অন্য কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা গেলে তা খাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। একইসঙ্গে নমুনা পরীক্ষার ব্যবস্থা করা এবং পরীক্ষার ফল না আসা পর্যন্ত কোনো গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার না করাই দায়িত্বশীল আচরণ।’

তিনি আরও বলেন, ‘খাদ্যের রং, গন্ধ বা গঠন স্বাভাবিক থাকলেও তা শতভাগ নিরাপদ এমন নয়। আবার শুধু রঙের পরিবর্তন দেখেই সেটিকে বিষাক্ত বলাও বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আমাদের মূলনীতি হওয়া উচিত- সন্দেহ হলে খাবেন না, পরীক্ষা করুন। মাংস কোথা থেকে এসেছে, কবে জবাই হয়েছে এবং কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এসব তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকা উচিত।’

পিএনএস /এএ

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন