শাহজালাল মাজার কমিটি ঘিরে দুই মন্ত্রীর দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে

  26-06-2026 10:47PM

পিএনএস ডেস্ক: হজরত শাহজালালের (রহ.) মাজারের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গঠিত ১২ সদস্যের উচ্চ পর্যায়ের কমিটিকে কেন্দ্র করে সিলেটের দুই প্রভাবশালী মন্ত্রীর মধ্যকার দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে এসেছে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটিতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী এবং সিলেট সিটি করপোরেশনের দুইবারের নির্বাচিত সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে রাখা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।

খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ও আরিফুল হক চৌধুরী দুজনই বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা এবং স্থানীয় রাজনীতিতে সমান প্রভাবশালী। গত সংসদ নির্বাচনে উভয়েই সিলেট-১ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহী ছিলেন। দলীয় সিদ্ধান্তে মুক্তাদির সিলেট-১ এবং আরিফুল হক চৌধুরী সিলেট-৪ আসন থেকে নির্বাচন করেন। দুজনেই বিজয়ী হয়ে মন্ত্রিত্ব পান। খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। আরিফুল হক চৌধুরী পান প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রিত্বে আসার পর দুজনের মধ্যে প্রকাশ্য কোনো বিরোধ না থাকলেও শুক্রবারের (২৬ জুন) কমিটি ঘোষণাকে ঘিরে পরিস্থিতি ভিন্ন রূপ নিয়েছে।

বাণিজ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন— সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মশিউর রহমান, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার, জেলা পরিষদের প্রশাসক, মাজারের মোতোয়াল্লি পরিবারের দুজন সদস্য এবং মাজার মাদ্রাসা ও মসজিদের দুজন প্রতিনিধি। কমিটির সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন সিলেটের জেলা প্রশাসক।

কমিটির সদস্যদের মধ্যে আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি এবং রেজাউল হাসান কয়েস লোদী সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্বে আছেন। দুজনেই স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে মুক্তাদিরের ঘনিষ্টজন হিসেবে পরিচিত।

বিষয়টি আরো আলোচনায় আসে এ কারণে যে, কমিটি ঘোষণার মাত্র দুই দিন আগে আরিফুল হক চৌধুরী নিজেই সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “মাজারের বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তার আলোচনা হয়েছে এবং সিলেটের সব সংসদ সদস্য, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক দলের নেতা ও সুশীল সমাজকে নিয়ে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”

কমিটি ঘোষণার দিনেও সিলেটেই ছিলেন আরিফুল হক চৌধুরী। তবে, শেষ পর্যন্ত কমিটিতে তার নাম না থাকায় রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে।

কমিটিতে আরিফুল হক চৌধুরীকে না রাখার কারণ জানতে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের মুঠোফোন ও হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। কমিটিতে না থাকার প্রতিক্রিয়া জানতে আরিফুল হক চৌধুরীর মুঠোফোনেও যোগাযোগ করা হলে তিনিও সাড়া দেননি। বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক মিফতা সিদ্দিকী অসুস্থতার কথা বলে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

কমিটি ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও সমালোচনা শুরু হয়েছে। সাংবাদিক মাসুদ আহমদ রনি লিখেছেন, “মাজার কোনো সংসদীয় আসনের বিষয় নয়; এটি পুরো সিলেটের ঐতিহ্য। তাই, সিলেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনপ্রতিনিধিকে বাইরে রাখায় প্রতিনিধিত্ব ও অন্তর্ভুক্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।”

সিলেট মহানগর বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “মাজারের দানের অর্থের স্বচ্ছতা নিশ্চিতের উদ্যোগকে অধিকাংশ মানুষ ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তবে, এমন একটি কমিটিতে সিলেটের মন্ত্রী ও দুইবারের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে না রাখায় বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অন্তত পরামর্শক বা আমন্ত্রিত সদস্য হিসেবে যুক্ত করা হলে প্রতিনিধিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠত না।”

কমিটি গঠনের পর বাণিজ্যমন্ত্রী মুক্তাদির বলেছেন, “দরগাহর উন্নয়ন ও দানের অর্থ ব্যবস্থাপনায় একটি যৌক্তিক সমাধানে পৌঁছাতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং আর্থিক হিসাবে স্বচ্ছতা আনতে মাজার কর্তৃপক্ষসহ সকলেই একমত হয়েছেন।”

তিনি বলেছেন, “আমরা পেছনের ঘটনা নিয়ে আলোচনা করতে চাই না। সামনে এগিয়ে যেতে চাই। কাজ করার দুটি পদ্ধতি আছে— একটি হলো কাজ করা আর আরেকটি হলো সবাইকে নিয়ে কাজ করা। আমরা সেরকম উদ্যোগ নিয়েছি, যাতে স্বচ্ছতাও আসবে, সবার অংশগ্রহণও থাকবে।”

গত ১২ জুন তৎকালীন জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম শাহজালাল ও শাহপরানের মাজার পরিদর্শনে গিয়ে আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ঘোষণা দেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮ জুন মাজারে নতুন চারটি দানবাক্স স্থাপন ও ঐতিহাসিক তিনটি দানের ডেগ এবং একটি দানবাক্স সিলগালা করা হয়। আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে ২১ জুন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ডিসি সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করে। পরদিন ২২ জুন দানবাক্স ও ডেগগুলো খুলে ৭০০ বছরের প্রথা ভেঙে প্রকাশ্যে অর্থ গণনা করা হয়। গণনা শেষে জানা যায়, চার দিনে আটটি ডেগ ও দানবাক্সে ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা, সাত আনা স্বর্ণালংকার ও ১০ সৌদি রিয়াল পাওয়া গেছে।


পিএনএস/রাআ

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন