বৃক্ষরোপণে মৃত্যুর পরও সওয়াব লাভ করা যায়

  20-06-2026 04:43PM


পিএনএস ডেস্ক: বিশেষ কিছু আমলের সওয়াব মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকে। ইসলামের পরিভাষায় এগুলোকে বলা হয় সদকায়ে জারিয়া। অর্থাৎ এমন কল্যাণকর কাজ, যার উপকারিতা দীর্ঘদিন মানুষের মধ্যে প্রবাহিত হতে থাকে এবং যার প্রতিদান আমলকারীর মৃত্যুর পরও তার আমলনামায় যুক্ত হতে থাকে।

মসজিদ নির্মাণ, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা, কূপ খনন, উপকারী জ্ঞান প্রচার এবং বৃক্ষরোপণ, এ সবই সদকায়ে জারিয়ার অন্তর্ভুক্ত। বর্তমান সময়ে পরিবেশ বিপর্যয়, জলবায়ু পরিবর্তন ও খাদ্য সংকটের প্রেক্ষাপটে বৃক্ষরোপণ একদিকে যেমন মানবতার সেবা, অন্যদিকে মহান ইবাদতও বটে।

ইসলাম প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতি অত্যন্ত যতœশীল। মহান আল্লাহ পৃথিবীকে মানুষের বসবাসের উপযোগী করে সৃষ্টি করেছেন এবং এর ভারসাম্য রক্ষার দায়িত্বও মানুষের ওপর অর্পণ করেছেন। বৃক্ষ মানুষের জীবন ও পরিবেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। গাছ আমাদের অক্সিজেন দেয়, ফল দেয়, কাঠ দেয়, ছায়া দেয় এবং পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখে। তাই বৃক্ষরোপণ সামাজিক দায়িত্বের পাশাপাশি মহান ইবাদত।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বৃক্ষরোপণে অত্যন্ত উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘কোনো মুসলমান যদি একটি গাছ রোপণ করে অথবা কোনো ফসল আবাদ করে, অতঃপর তা থেকে কোনো মানুষ, পাখি বা প্রাণী আহার করে, তবে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হবে।’ (সহিহ বুখারি ২৩২০)

এই হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, একটি গাছ থেকে যত মানুষ, পশু-পাখি ও জীবজন্তু উপকৃত হবে, ততবার রোপণকারীর আমলনামায় সওয়াব লেখা হবে। এমনকি গাছের মালিকের অনুমতি ছাড়া কেউ ফল খেয়ে নিলেও সেই উপকারের বিনিময়ে মালিক সওয়াব পাবেন।

অপর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যদি কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময় তোমাদের কারও হাতে একটি চারাগাছ থাকে এবং সে যদি কেয়ামত শুরু হওয়ার আগেই তা রোপণ করতে সক্ষম হয়, তবে সে যেন তা রোপণ করে দেয়।’ (মুসনাদে আহমদ ১২৯০২)

এই হাদিসে বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব এতটাই তুলে ধরা হয়েছে যে, পৃথিবীর শেষ মুহূর্তেও একটি গাছ রোপণের প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। কারণ ইসলাম নির্মাণ ও কল্যাণের শিক্ষা দেয়।

বৃক্ষরোপণ সদকায়ে জারিয়া হওয়ার অন্যতম কারণ হলো, এর উপকারিতা দীর্ঘস্থায়ী। একজন ব্যক্তি একটি আম, কাঁঠাল, লিচু বা নারকেলগাছ রোপণ করলেন। হয়তো তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন, কিন্তু গাছটি বহু বছর ধরে ফল দিচ্ছে। মানুষ ফল খাচ্ছে, পাখি আশ্রয় নিচ্ছে, পথিক ছায়া পাচ্ছে। এভাবে বছরের পর বছর তার আমলনামায় সওয়াব যুক্ত হতে থাকবে। এটি এমন একটি বিনিয়োগ, যার লাভ আখেরাত পর্যন্ত বিস্তৃত।

বর্তমান পৃথিবীতে জলবায়ু পরিবর্তন একটি বড় সংকট। বন উজাড়, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং পরিবেশ দূষণের কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই সংকট মোকাবিলায় বৃক্ষরোপণের বিকল্প নেই।

একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে পরিবেশকে শীতল রাখতে সাহায্য করে। তাই একটি গাছ লাগানো মানে শুধু একটি চারা রোপণ নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী নির্মাণ করা।

আমাদের সমাজে অনেক মানুষ আছেন, যারা শহরে বসবাস করেন। ইচ্ছা থাকলেও জায়গার অভাবে বড় পরিসরে বাগান করতে পারেন না। কিন্তু তারা চাইলে গ্রামে বসবাসরত দরিদ্র ও বৃক্ষপ্রেমী মানুষের হাতে ফলের চারা তুলে দিতে পারেন অথবা একটি ফলের বাগান প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করতে পারেন। এতে একদিকে যেমন সদকায়ে জারিয়ার সওয়াব অর্জিত হবে, অন্যদিকে দরিদ্র পরিবারগুলো অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পাবে। একটি ফলের বাগান বহু পরিবারের জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম হতে পারে।

বৃক্ষরোপণ সমাজকল্যাণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। গ্রামের রাস্তার পাশে, মসজিদ-মাদ্রাসার আঙিনায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কবরস্থানে কিংবা খালি জমিতে গাছ লাগানো হলে সমাজের সবাই উপকৃত হয়। বিশেষ করে ফলদ, ঔষধি ও বনজ বৃক্ষ মানুষের নানাবিধ প্রয়োজন পূরণ করে। তাই ব্যক্তি উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়েও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন।

ইসলামের দৃষ্টিতে পৃথিবী মানুষের কাছে একটি আমানত। এই আমানতের যথাযথ হেফাজত করা প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব। অযথা বৃক্ষনিধন, পরিবেশ দূষণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অপচয় এই আমানতের খেয়ানত। পক্ষান্তরে বৃক্ষরোপণ, বন সংরক্ষণ এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা হলো আমানতের হক আদায় করা। তাই একজন সচেতন মুসলমান কখনো পরিবেশ ধ্বংসের কাজে অংশ নিতে পারেন না।

আজ আমাদের প্রয়োজন পরিবারভিত্তিক ও সমাজভিত্তিক বৃক্ষরোপণ আন্দোলন গড়ে তোলা। জন্মদিন, বিয়ে, হজ পালন, কোনো প্রিয়জনের মৃত্যু কিংবা বিশেষ কোনো উপলক্ষে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে বৃক্ষরোপণের সংস্কৃতি চালু করা যেতে পারে। এতে মানুষের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে এবং সদকায়ে জারিয়ার চেতনা আরও প্রসারিত হবে।

বৃক্ষরোপণ এমন একটি মহৎ কাজ, যা দুনিয়া ও আখেরাত উভয় ক্ষেত্রেই কল্যাণ বয়ে আনে। এটি পরিবেশ রক্ষা করে, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করে, দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং রোপণকারীর জন্য অবিরাম সওয়াবের উৎস হয়ে থাকে।



পিএনএস/এমএইউ

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন