চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ককে ভারত নিতে পারছে না স্বাভাবিকভাবে

  23-07-2026 11:54AM


পিএনএস ডেস্ক: নিরাপত্তা ঝুঁকি ও কৌশলগত উদ্বেগের চোখে চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ককে দেখছে ভারত। অথচ বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পরপরই দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ রীতিমতো সামরিক অভিযান চালিয়ে দখল করে নিয়েছিল ভারত। পরে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সামরিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে দক্ষিণ তালপট্টি উদ্ধার করা হলেও ভারত আগ্রাসী পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় নদীর স্রোত পরিবর্তন করায় তালপট্টি দ্বীপটির অস্তিত্ব বঙ্গোপসাগরে বিলীন হয়ে যায়। বাংলাদেশকে নিয়ে ভারতের মনোভাবের যে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি তার প্রমাণ আজো দিয়ে যাচ্ছেন দেশটির অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা, কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

বছরের পর বছর তিস্তা নদী ও মংলা বন্দর ব্যবস্থাপনা প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশ সুযোগ দিলেও ভারত কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এখন এ দু’টি প্রকল্প নিয়ে চীনের উদ্যোগকে ভারতের নিরাপত্তায় ‘রেড লাইন’ হিসেবে দেখছেন ভারতীয় বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, শিলিগুড়ি করিডোর থেকে এত কাছে চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি ‘পাওয়ার চীন’-এর দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি ভারতের জন্য একটি বড় নিরাপত্তা হুমকি। ইতোমধ্যে ৫০ জন চীনা প্রকৌশলী ও কারিগরি বিশেষজ্ঞের একটি দল সমীক্ষা চালাতে বাংলাদেশে পৌঁছেছে। ভারতীয় ইউটিউব চ্যানেল নিউজ নাইন লাইভে তারা বাংলাদেশের এ ধরনের অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে যেকোনো উপায়ে বাধা দেয়ার অঙ্গীকার প্রকাশ করেন। তারা চান ভারতের উচিত অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করে এমনভাবে একটি কমান্ড ও কন্ট্রোল ব্যবস্থা তৈরি করা যাতে চীনের মোকাবেলা করা যায় এবং সেটা প্রয়োজনে বাংলাদেশের মাধ্যমে ভারত মোকাবেলা করতে সক্ষম হবে।

বীণা সিক্রির বয়ান : ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি মনে করেন, ‘চিকেন’স নেক’-এর মাত্র ২২ কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশে চীনা ইঞ্জিনিয়ারদের উপস্থিতি ভারতের জন্য একটি “বড় ধরনের নিরাপত্তা হুমকি”, চীন বেশ কয়েক বছর ধরেই এই প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার জন্য শেখ হাসিনা সরকারের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছিল। ভারত হাসিনা সরকারকে জানিয়েছিল যে, এই এলাকায় চীনের উপস্থিতি ভারতের জন্য একটি ‘সিকিউরিটি রেড লাইন’ বা নিরাপত্তা সীমারেখা, যা ভারত কখনোই মেনে নেবে না। শেখ হাসিনা ভারতের এই উদ্বেগকে সম্মান জানিয়েছিলেন এবং ২০২৪ সালের জুনে ভারত সফরের সময় প্রকল্পটি ভারতকে দেয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছিলেন।

বীণা সিক্রির মতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পর বর্তমান সরকার ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগকে কোনো গুরুত্ব দিচ্ছে না। তারেক রহমান ক্ষমতায় এসে প্রথমে ভারত সফর করেননি। তারা এক দিকে চীনকে প্রকল্প দিচ্ছে, অন্য দিকে ভারতের কাছে বিষয়টিকে অত্যন্ত প্রাথমিক পর্যায়ের বলে ছোট করে দেখানোর চেষ্টা করছে। তিনি ভারতকে এখনই এ বিষয়ে সজাগ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে মন্তব্য করেন, ভারতকে জেগে উঠতে হবে এবং বাস্তবটা উপলব্ধি করতে হবে। শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের উদাহরণ টেনে বীণা বলেন, চীন পাঁচ বছরের মধ্যে সাত হাজার কোটি টাকা ঋণ পরিশোধের যে শর্ত দিয়েছে, তা পূরণ করা বাংলাদেশের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। ঋণ শোধ করতে না পারলে চীন এই প্রকল্পের জমি বা অবকাঠামো দীর্ঘমেয়াদি লিজ হিসেবে দখল করে নিতে পারে, যা ভারতের সংবেদনশীল সীমান্তের ঠিক পাশেই একটি চীনা নিয়ন্ত্রিত এলাকা তৈরি করবে।

বীণা আরো উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশে পাকিস্তানের প্রভাব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং কট্টরপন্থী সংগঠনগুলো সক্রিয় হয়ে উঠছে, যা ভারতের স্বার্থবিরোধী। এ ছাড়া মংলা বন্দর এবং কক্সবাজারে চীনা সাবমেরিন ঘাঁটির নির্মাণ বঙ্গোপসাগরে চীনের উপস্থিতিকে বিপজ্জনক করে তুলছে। জোরালোভাবে বীণা ভারত সরকারকে বাংলাদেশকে স্পষ্টভাবে জানাতে বলেন যে এই প্রকল্পটি ভারত কোনোভাবেই এগিয়ে যেতে দেবে না। বাংলাদেশে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, তাদের ভারতের নিরাপত্তা সীমারেখাকে সম্মান করতে হবে।

ভারতীয় বিশেষজ্ঞদের ধারণা পাওয়ার চীন কোম্পানিটি চীনা সামরিক বাহিনীর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে। সমীক্ষার নামে তারা তিস্তার গভীরতা, মাটির গঠন এবং পানির প্রবাহ সংক্রান্ত এমন সব তথ্য সংগ্রহ করতে পারে, যা ভবিষ্যতে নৌ বা স্থল সামরিক অভিযানে কাজে লাগানো সম্ভব। এ ছাড়া চীনের জাতীয় গোয়েন্দা আইন অনুযায়ী, যেকোনো চীনা কোম্পানি তাদের সংগৃহীত তথ্য কমিউনিস্ট পার্টির সাথে শেয়ার করতে বাধ্য।

এ ছাড়া বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে ২০টি জে-১০ সি যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে আলোচনা করছে। চীন কক্সবাজারে একটি সাবমেরিন ঘাঁটি তৈরি করছে এবং লালমনিরহাট এয়ারবেসের অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়তা দিচ্ছে। যা ভারতের নিরাপত্তার জন্য চিরস্থায়ী উদ্বেগ এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রে চীনের এই ক্রমবর্ধমান পদচিহ্ন এবং পাকিস্তান-চীন অক্ষের সক্রিয়তা ভারতের জন্য একটি “মেজর সিকিউরিটি থ্রেট”।

তাহলে বাংলাদেশ কী করবে : গত কয়েক দশক ধরে ভারত ফারাক্কা ও গজলডোবার মতো বাঁধ নির্মাণ করে বাংলাদেশের নদীর স্বাভাবিক গতিপথ রুদ্ধ করে বাংলাদেশকে পানিশূন্য করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। বাংলাদেশে শত শত নদী হত্যা ও মরুভূমিময় পরিবেশ সৃষ্টিতে শুধু কৃষিতে ব্যয় বৃদ্ধি পায়নি লাখো লাখো মানুষ কর্মসংস্থানের খোঁজে গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর জেগে ওঠা দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপটি ভারত শুধু অবৈধভাবে দখল করেনি পরে কৃত্রিম নদী শাসনের মাধ্যমে হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর স্রোত ও পলি নিয়ন্ত্রণ করে কৃত্রিমভাবে দ্বীপটিকে বঙ্গোপসাগরে ডুবিয়ে দেয়, ফলে এটি মানচিত্র থেকে হারিয়ে যায়। ১৯৮৪ থেকে ২০২৫ সালের উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূলে, বিশেষ করে নোয়াখালী ও এর আশপাশে প্রায় ৮০০ বর্গ কিলোমিটারের বেশি নতুন ভূমি জেগে উঠেছে, যা আয়তনে সিঙ্গাপুর ও মালদ্বীপের সম্মিলিত আয়তনের সমান। এ ছাড়া সাগরের বুকে আরো প্রায় ১০০০ বর্গ কিলোমিটারের ডুবোচর জেগে ওঠার অপেক্ষায় আছে, যা অদূর ভবিষ্যতে মূল ভূখণ্ডের সাথে যুক্ত হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক প্রযুক্তিগত ও ভৌগোলিক ব্যবস্থাপনা (যেমন ক্রস ড্যাম) গ্রহণ করলে এই ভূখণ্ডের আয়তন ভবিষ্যতে ১৫ হাজার বর্গ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। হিমালয় থেকে নেমে আসা গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদী ব্যবস্থা প্রতি বছর প্রায় ১.২ বিলিয়ন টন পলি মেঘনা নদী হয়ে নোয়াখালী উপকূলে জমা হওয়ার ফলে প্রতি বছর প্রায় ২০ কিলোমিটার নতুন ভূমি জেগে উঠছে। বাংলাদেশ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে এই নতুন ১৫ হাজার বর্গ কিলোমিটার ভূখণ্ড রক্ষায় নি-িদ্র সামরিক ও নৌ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিবে নাকি সমুদ্র সীমা জয়ের পরও ভারতের ইশারায় হাসিনার মতো নতজানু হয়ে থাকবে। বাংলাদেশ নিশ্চুপ থেকে বঙ্গোপসাগর থেকে কেবল ভারত ও মিয়ানমারের তেল-গ্যাস উত্তোলন চেয়ে চেয়ে দেখবে।

বাংলাদেশ বুঝে গেছে : যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরান যুদ্ধের পর ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে বাংলাদেশ শিক্ষা নিচ্ছে। বাংলাদেশকে কোণঠাসা করে রাখার ভারতীয় নীতি আর কাজ করছে না। যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর নির্ভরতা কমাচ্ছে, অন্য দিকে চীন বাংলাদেশের সাথে মেগা প্রজেক্ট ও সামরিক চুক্তিতে যুক্ত হচ্ছে। একমাত্র ক্রমবর্ধমান সামরিক সক্ষমতা বাংলাদেশকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশ শিখেছে যে, প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভৌগোলিক অস্ত্র ব্যবহার করে নতুন ভূমি ধ্বংস করতে পারে, তাই পলিপ্রবাহ ও নদী শাসনের বিষয়ে সজাগ থাকা জরুরি। তাই ভারতীয় বিশেষজ্ঞদেরও বুঝা উচিত বিশ্বরাজনীতিতে ভারতের একাধিপত্য কমছে এবং চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তিগুলোর কৌশলগত অবস্থান বাংলাদেশের পক্ষে যাচ্ছে। ভারত এখন আগের মতো চাইলেই কোনো উসকানি বা বিতর্ক সৃষ্টি করে পার পাচ্ছে না। কারণ ঢাকা এখন ভারতের সাথে “চোখে চোখ রেখে” কথা বলছে এবং যেকোনো উসকানির কড়া জবাব দিচ্ছে।

তারপরও একই প্যাচাল : ভারতের প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ মেজর জেনারেল (অব:) সঞ্জয় সোয়েন বলেন, তিস্তা প্রকল্পে চীনের কারিগরি ও কৌশলগত উপস্থিতি শিলিগুড়ি করিডোরটিকে অত্যন্ত সুরক্ষাহীন করে তুলছে। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে চীনকে বেছে নিয়েছে এবং আগের সরকারের নেয়া ভারতের অনুকূল সিদ্ধান্তগুলো পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। লালমনিরহাট বিমানঘাঁটি চীন সংস্কার করতে চাইছে, যা ভারতের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। পাকিস্তানের পর বাংলাদেশ এখন চীনা অস্ত্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রেতা হিসেবে ট্যাংক ও মিসাইল কেনার পাশাপাশি এখন ২০টি জে-১০সি যুদ্ধবিমান কেনার আলোচনা করছে। তার মতে, বাংলাদেশে পাকিস্তান ও চীনের গোয়েন্দা সংস্থা অত্যন্ত সক্রিয় এবং তারা যৌথভাবে ভারতের বিরুদ্ধে কাজ করছে। চীন তার ‘ঋণ কূটনীতি’ ব্যবহার করে বাংলাদেশকে নিজেদের একটি ‘প্রক্সি’ রাষ্ট্রে পরিণত করছে। তিনি বলেন, মংলা ও চট্টগ্রাম বন্দর চীনকে ব্যবহারের সুযোগ দেয়া ভারতের চার পাশে চীনের ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ বা ভারতকে ঘিরে ফেলার কৌশল। যার অন্যান্য প্রান্তে রয়েছে গোয়াদর (পাকিস্তান), হাম্বানটোটা (শ্রীলঙ্কা) ও মিয়ানমার। চীন তার সহযোগীদের রিয়েল-টাইম ইন্টেলিজেন্স, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অবস্থানের তথ্য দিয়ে সহায়তা করে, যা যুদ্ধের সময় ভারতের সামরিক প্রস্তুতির জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হতে পারে। জেনারেল সোয়েন জানান, ভারত ইতোমধ্যেই শিলিগুড়ি করিডোর সুরক্ষিত করতে অতিরিক্ত সৈন্য মোতায়েন, প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার এবং অতিরিক্ত রেললাইন স্থাপন করলেও সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি ভারতের নিরাপত্তার জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয়।

ভারতীয় গবেষণা বিশ্লেষণ : তক্ষশীলা ইনস্টিটিউশনের গবেষণা বিশ্লেষক আনুষ্কা স্যাক্সেনার দাবি- শি জিন পিংয়ের অধীনে জ্বালানি বা পরিবেশ সংক্রান্ত যেকোনো প্রকল্পকেই “জাতীয় নিরাপত্তা”-এর অংশ হিসেবে দেখা হয়। তিস্তা প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে চীন এমন কিছু তথ্য সংগ্রহ করতে পারে যা সরাসরি সামরিক কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। এগুলোর মধ্যে নদীর গভীরতা, মাটির গঠন, পানির প্রবাহের সময় এবং পানির রাসায়নিক গঠন সংক্রান্ত তথ্যগুলো শিলিগুড়ি করিডোরের কাছে কোনো স্থল বা নৌ সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য চীনের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান। ভারত মহাসাগরে চীনের বৈজ্ঞানিক জাহাজগুলো যেভাবে লবণাক্ততা এবং পানির তাপমাত্রা পরিমাপ করে সাবমেরিন চলাচলে সহায়তা করে, তিস্তা নদীর এই জরিপও একই ধরনের কৌশলগত সুবিধা দিতে পারে। আনুষ্কা স্যাক্সেনার মতে, চীন বাংলাদেশ বা পাকিস্তানে যা কিছু করছে তা মূলত ভারতের বিরুদ্ধে একটি ‘প্রক্সি’ বা পরোক্ষ লড়াই।

পিএনএস/আনোয়ার

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন