জলাবদ্ধতায় নেওয়া যায়নি হাসপাতালে; ঘরেই মারা গেলেন প্রসূতি

  15-07-2026 06:36PM

পিএনএস ডেস্ক: নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নে জলাবদ্ধতা ও ভেঙে পড়া যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয়নি নাজমা আক্তার (৩০) নামে প্রসূতিকে। এতে চিকিৎসার অভাবে ঘরেই অনাগত সন্তানসহ মারা যান তিনি।

বুধবার (১৫ জুলাই) দুপুরে নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইসলামপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত নাজমা আক্তার ওই গ্রামের বাসিন্দা।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, নাজমার আগে দুটি সন্তান রয়েছে। এটি ছিল তার তৃতীয় সন্তান।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ, অস্বাভাবিক জোয়ার এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় নিঝুমদ্বীপের বিস্তীর্ণ এলাকা এখনও পানির নিচে রয়েছে। গত ২ দিনে কিছু এলাকায় পানি কমলেও, বুধবার দুপুরে অতিরিক্ত জোয়ারে ইসলামপুর গ্রামের বিভিন্ন সড়ক, কাঁচা রাস্তা ও চলাচলের পথ আবারও তলিয়ে যায়। এতে পুরো এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

এ অবস্থায় বুধবার সকালে নাজমা আক্তারের প্রসববেদনা শুরু হলে, স্বজনরা দ্রুত তাকে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু চারপাশে পানি জমে থাকায় কোনো যানবাহন চলাচল করতে পারেনি। বিকল্পভাবে নৌকায় নেওয়ারও উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকায়, তাকে ঘর থেকে বের করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘসময় প্রসব যন্ত্রণার পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও শারীরিক জটিলতা দেখা দিলে, একপর্যায়ে ঘরেই অনাগত সন্তানসহ তার মৃত্যু হয়।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বছরের পর বছর ধরে নিঝুমদ্বীপে দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা এবং জলাবদ্ধতার সমস্যা থাকলেও কার্যকর কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। ফলে, জরুরি মুহূর্তে রোগীদের হাসপাতালে পৌঁছানো অনেক সময় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

ইউপি সদস্য কেফায়েত হোসেন বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে জোয়ারের পানি ও জলাবদ্ধতায় নিঝুমদ্বীপের নিম্নাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। অনেক এলাকায় সড়ক পানির নিচে থাকায়, জরুরি রোগীদের হাসপাতালে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। নাজমা আক্তারের মৃত্যু সেই দুর্ভোগেরই করুণ উদাহরণ। আমরা এমন মৃত্যু আর দেখতে চাই না।’

স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক বেলাল উদ্দিন বলেন, ‘নিঝুমদ্বীপে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের বসবাস হলেও, এখানকার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক। জরুরি চিকিৎসা পাওয়ার মতো কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের অধীনে একটি স্বাভাবিক (নরমাল) প্রসবসেবা কেন্দ্র এবং ৩টি কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও সেগুলোতে প্রয়োজনীয় জনবল, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও সেবার ঘাটতি রয়েছে। ফলে, সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশেষ করে প্রসূতি মা, শিশু, বৃদ্ধ ও জরুরি রোগীদের জন্য পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ।’

তিনি আরও বলেন, ‘কোনো রোগীর অবস্থা গুরুতর হলে তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিতে হয়। কিন্তু দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া, জোয়ার-ভাটা, জলাবদ্ধতা ও যাতায়াত সংকটের কারণে অনেক সময় রোগীকে সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। নাজমা আক্তারের মৃত্যু এ অঞ্চলের ভঙ্গুর স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও যোগাযোগ সংকটের একটি নির্মম উদাহরণ। অবিলম্বে নিঝুমদ্বীপে একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ২৪ ঘণ্টা মাতৃসেবা এবং জরুরি রোগী পরিবহনের ব্যবস্থা চালু করা না হলে ভবিষ্যতে আরও এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটতে পারে।’

নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লাভলী আক্তার বলেন, ‘আমাদের এখানে ভালো রাস্তা নেই, উন্নত স্বাস্থ্যসেবাও নেই। মানুষের সামান্য চিকিৎসা পেতেও অনেক কষ্ট করতে হয়। এই মৃত্যুর দায় অবকাঠামোগত সংকট এড়াতে পারে না।’

স্থানীয়দের দাবি, নিঝুমদ্বীপে টেকসই সড়ক যোগাযোগ, জরুরি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স এবং উন্নত মাতৃস্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত না করা হলে ভবিষ্যতেও এমন মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। তাই দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।


পিএনএস/এএ

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন