পিএনএস ডেস্ক : রাজবাড়ীতে গ্রাহকদের কোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছেন প্রধান ডাকঘরের লেটার রাইটার শিহাব মৃধা (৩০)। এতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকেরা। টাকা ফেরত পাওয়ার দাবিতে গত কয়েক দিন ধরে প্রধান ডাকঘরে বিক্ষোভ করছেন তারা।
পলাতক শিহাব মৃধা রাজবাড়ী সদর উপজেলার মূলঘর ইউনিয়নের রশোড়া বাঘিয়া গ্রামের আয়ুব আলী মৃধার ছেলে।
জানা গেছে, রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরে লেটার রাইটার হিসেবে কাজ করতেন শিহাব মৃধা। কোনো গ্রাহক ফরম পূরণ করতে না পারলে তিনি তা লিখে দিতেন—এটিই ছিল তার কাজ। এর বিনিময়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে কিছু নগদ অর্থ পেতেন তিনি। ডাকঘরে কোনো গ্রাহক মেয়াদি হিসাব খুলতে আসলে অন্য কর্মচারীরা, এমনকি তৎকালীন পোস্টমাস্টারও গ্রাহকদের শিহাবের কাছে পাঠিয়ে দিতেন। এই সুযোগে শিহাব মৃধা ডাকঘরে আগত গ্রাহকদের মেয়াদি হিসাব খুলে দেওয়ার কথা বলে সাদা স্লিপ ধরিয়ে বলতেন, কয়েক দিন পরে এসে বই নিয়ে যেতে। একপর্যায়ে বিভিন্ন সময়ে ৭০ থেকে ৮০ জন গ্রাহকের কাছ থেকে প্রায় কোটি টাকা গ্রহণ করেন তিনি। কিন্তু সেই টাকা পোস্ট অফিসের কাউন্টারে জমা না দিয়ে নিজেই আত্মসাৎ করেন।
বিষয়টি জানাজানি হলে গত ১২ জুলাই কুষ্টিয়া বিভাগীয় অফিস থেকে পোস্টাল সুপার তদন্তে এসে শিহাব মৃধাকে ডাকঘরে হাতেনাতে পেয়ে যান। তবে শিহাব সেখান থেকে কৌশলে পালিয়ে আত্মগোপনে চলে যান। এরপর থেকেই তার কোনো খোঁজ মিলছে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের একজন কর্মকর্তা জানান, শিহাব মৃধার একার পক্ষে এত টাকা আত্মসাৎ করা সম্ভব নয়। শিহাব ডাকঘরের পোস্টমাস্টারসহ অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহযোগিতা নিয়েই গ্রাহকদের এই টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
হুমায়ুন মিয়া নামের একজন ভুক্তভোগী জানান, আমার এলাকার জামান নামে একজন রাজবাড়ী পোস্ট অফিসে চাকরি করতেন। আমি তিন বছর মেয়াদি এফডিআর করার জন্য তার কাছে দুই লাখ টাকা দিই। তিনি ফরম পূরণ করে দিয়ে বলেন, আপনি শিহাবের কাছে টাকা জমা দিন। এরপর আমি শিহাবের কাছে দুই লাখ টাকা জমা দিই। এই কাজের বিনিময়ে শিহাব আমার কাছ থেকে ৩০০ টাকা নেয়। পরে সে একটা স্লিপ দিয়ে বলে, এক সপ্তাহ পর এসে বই নিয়ে যাবেন। এরপর আর কোনো খবর নেই। পরে শুনি শিহাব পলাতক। এখন আমার টাকার কী হবে?
তিনি আরও বলেন, আমি যার মাধ্যমে টাকা দিয়েছিলাম, সেই জামান এখান থেকে বদলি হয়ে গেছেন। তিনি বলছেন শিহাব টাকা নিয়ে পালিয়েছে, সে টাকা ফেরত দেবে বলেছে; সে দিলে আপনারা টাকা ফেরত পাবেন।
রাবেয়া নামের এক নারী বলেন, আমি গরু, ছাগল বিক্রি করে ও সমিতি থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ তুলে আমার স্বামী শরীফের নামে দুই লাখ টাকার মেয়াদি হিসাব খুলি। শিহাব আমার কাছ থেকে টাকা নিয়ে একটি স্লিপ ধরিয়ে দেয়। এখন সে পলাতক। আমি কিস্তির টাকা দেবো কীভাবে?—এই বলে তিনি আহাজারি শুরু করেন।
মোনালিসা ইমাম নামের আরেক গ্রাহক বলেন, রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরে দুই লাখ টাকার একটি মেয়াদি হিসাব খুলি। পোস্ট অফিসে গেলে লেটার রাইটার শিহাব মৃধা আমার লেখালেখিসহ যাবতীয় কাজ করে দেয়। সে আমাকে জানায়, এক সপ্তাহ বা দশ দিন পর এসে বই নিয়ে যেতে। কিন্তু আমি দশ দিন পর পোস্ট অফিসে বই নিতে গেলে ডাকঘর থেকে জানায়, আমার নামে কোনো হিসাব খোলা হয়নি। পরবর্তীতে আমি জানতে পারি, ওই শিহাব মৃধা আমারসহ আরও অনেকের টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়ে গেছে।
শুধু এরাই নন, তাদের মতো আরও ৭০ থেকে ৮০ জন গ্রাহক টাকা দিয়ে মেয়াদি হিসাব খুলে শুধু ছোট কাগজের স্লিপ পেয়েছেন। শিহাব তাদের কাছ থেকে প্রায় কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে পালিয়ে গেছেন।
ভুক্তভোগী গ্রাহকদের দাবি, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে আত্মসাৎকৃত অর্থ উদ্ধার, ক্ষতিগ্রস্তদের টাকা দ্রুত ফেরত প্রদান এবং এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের নবাগত পোস্টমাস্টার শামীম আহমেদ বলেন, ২০২১ সাল থেকে শিহাব মৃধা রাজবাড়ী পোস্ট অফিসে হেল্পিং হ্যান্ড হিসেবে লেটার রাইটার পদে কাজ করত। সে সরকারি কোনো কর্মচারী নয়। ডিজি অফিসের নির্দেশে প্রতিটি পোস্ট অফিসে এমন পদে লোক রয়েছে। গ্রাহকেরা রাজবাড়ী পোস্ট অফিসে মেয়াদি হিসেবে টাকা রাখতে আসলে সে লেখালেখিসহ টাকা রাখা ও বিতরণের কাজ করত। সে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকাগুলো নিয়ে সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে প্রায় কোটি টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়ে গেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত গ্রাহকদের রাখা টাকা সে আত্মসাৎ করে।
তিনি আরও বলেন, আমি চলতি বছরের গত ৬ জুলাই যোগদান করি। যোগদানের পরই বিষয়টি আমার নজরে আসে। তখন আমি আমাদের কুষ্টিয়ার প্রশাসনিক অফিসকে বিষয়টি অবগত করি। কর্তৃপক্ষ জিডি করতে বললে আমি রাজবাড়ী সদর থানায় একটি জিডি করতে যাই; কিন্তু থানা পুলিশ জিডি গ্রহণ না করে মামলার পরামর্শ দেন। আমরা রাজবাড়ী অফিস নিজেরা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। তাই পরে আমি কুষ্টিয়া অফিসকে বিষয়টি জানাই এবং কুষ্টিয়া অফিস খুলনা সার্কেল অফিসকে অবহিত করে। খুলনা অফিস এই মুহূর্তে মামলা না করে ঘটনাটি অধিকতর তদন্ত করতে চার সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটি তদন্ত করে সিদ্ধান্ত দেওয়ার পর আমরা পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেব।
একটি সূত্রে জানা যায়, কোটি টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়ে যাওয়া শিহাব মৃধা রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের কর্মরত এমএলএসএস (অফিস সহায়ক) রেজাউল আলমের আপন ভাগ্নে। এ ছাড়াও জানা গেছে, এই রেজাউলের আপন ভাই ও মেইল ক্যারিয়ার মো. আলী আক্কাস ২০০৭ সালে পোস্ট অফিসের গ্রাহকদের ১১ লাখের বেশি টাকা নিয়ে পালিয়েছিলেন। সেই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর মামলা হলে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয় এবং মামলায় তিনি কারাভোগ করেন।
পিএনএস /এএ
রাজবাড়ী পোস্ট অফিসের শতাধিক গ্রাহকদের কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
26-07-2026 07:50PM

