পিএনএস ডেস্ক: ইসরায়েলের কারাগার ও আটককেন্দ্রগুলোতে ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে চলা নির্যাতনের নতুন ও ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে আলজাজিরা।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) প্রকাশিত কাতারভিত্তিক এই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের ‘বডিজ অব এভিডেন্স: ইসরায়েল’স ডার্কেস্ট ওয়েপন’ শিরোনামের অনুসন্ধানী তথ্যচিত্রে এ তথ্য জানানো হয়। সাবেক ফিলিস্তিনি বন্দিদের সাক্ষ্য, মানবাধিকারকর্মীদের বক্তব্য ও বিভিন্ন নথিপত্রের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বন্দিদের ওপর কেবল শারীরিক নির্যাতনই নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে যৌন সহিংসতা, অপমান ও মানসিক নির্যাতনের অংশ হিসেবে কুকুর ব্যবহার করা হয়েছে।
গাজার খান ইউনিসের বাসিন্দা মোহাম্মদ জাকি আল-বাকরি প্রায় ২০ মাস ইসরায়েলি কারাগারে বন্দি ছিলেন। এ সময় তাকে একাধিক আটককেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়। আলজাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বন্দিদের চোখ বেঁধে, হাত-পা বেঁধে এবং বিবস্ত্র করে রাখা হতো। এরপর তাদের ওপর বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হতো।
আল-বাকরির ভাষ্য অনুযায়ী, নির্যাতনের সময় কুকুরকে শুধু ভয় দেখানোর জন্য নয়, বরং অপমান ও যৌন সহিংসতার একটি উপকরণ হিসেবেও ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, একাধিক বন্দি একই ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তার অভিযোগ, বন্দিরা সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থায় থাকলেও নির্যাতনকারীরা হাসাহাসি করত এবং পুরো ঘটনাগুলো ভিডিও ধারণ করত।
তথ্যচিত্রে আরও কয়েকজন সাবেক বন্দি একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। নিরাপত্তার কারণে তাদের প্রকৃত পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে। তাদের একজন বলেন, ইসরায়েলের কুখ্যাত সদে তেইমান আটককেন্দ্রে বন্দিদের ওপর নিয়মিতভাবে কুকুর লেলিয়ে দেওয়া হতো। বন্দিদের বিবস্ত্র করা, মারধর করা, দীর্ঘ সময় হাত-পা বেঁধে রাখা এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের পাশাপাশি কুকুর দিয়ে হামলা চালানো ছিল নির্যাতনের অংশ।
আলজাজিরার অনুসন্ধান অনুযায়ী, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো কারাগার বা নির্দিষ্ট কিছু কারারক্ষীর কর্মকাণ্ড নয়। বরং বিভিন্ন সময় ও বিভিন্ন স্থানে বন্দি থাকা ব্যক্তিদের সাক্ষ্যে একই ধরনের নির্যাতনের পুনরাবৃত্তি দেখা গেছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, এটি একটি পদ্ধতিগত প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে।
মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, যৌন সহিংসতা এবং অপমানজনক আচরণকে অনেক সময় বন্দিদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ফিলিস্তিনি নারী অধিকার সংগঠন উইমেন্স সেন্টার ফর লিগ্যাল এইড অ্যান্ড কাউন্সেলিংয়ের প্রতিনিধিরা বলেছেন, সামাজিক লজ্জা ও কলঙ্কের কারণে অনেক ভুক্তভোগী তাদের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করতে চান না। ফলে প্রকৃত ঘটনার সংখ্যা প্রকাশিত অভিযোগের চেয়ে অনেক বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অধিকৃত পশ্চিম তীরের বাসিন্দা আদনান হাসান, যিনি কিশোর বয়সে পাঁচ মাস বন্দি ছিলেন, তিনি জানান যে, তাকে বারবার বিবস্ত্র করা হয়েছে এবং অপমানজনকভাবে দেহ তল্লাশি করা হয়েছে। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন আরও কয়েকজন সাবেক বন্দি।
জাতিসংঘের অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রান্সেসকা আলবানিজ তথ্যচিত্রে বলেন, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে কুকুর ব্যবহার করে হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং নির্যাতনের অভিযোগ বহু বছর ধরে উঠে আসছে। তার মতে, বন্দিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যগুলো একটি বৃহত্তর নির্যাতন কাঠামোর ইঙ্গিত দেয়, যেখানে মারধর, চিকিৎসা বঞ্চনা, অনাহার, একাকী কারাবাস এবং যৌন সহিংসতা একসঙ্গে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ফিলিস্তিনি সূত্রগুলোর হিসাব অনুযায়ী, ১৯৬৭ সাল থেকে ইসরায়েল ৭ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে আটক করেছে। অন্যদিকে জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৭ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে আট লাখের বেশি ফিলিস্তিনি কারাবন্দি হয়েছেন। ফলে ফিলিস্তিনি সমাজে কারাবন্দি হওয়ার অভিজ্ঞতা একটি প্রজন্মগত বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
তথ্যচিত্রে শুধু কারাগারের নির্যাতন নয়, অধিকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের হামলার ঘটনাও উঠে এসেছে। মোহাম্মদ আবু কাবাশ ও তার ভাই সোহাইব আবু কাবাশ অভিযোগ করেন, একদল সশস্ত্র বসতি স্থাপনকারী গভীর রাতে তাদের এলাকায় হামলা চালায়। হামলাকারীরা পরিবারের সদস্যদের মারধর করে, হাতকড়া পরায়, সম্পদ লুট করে এবং অপমানজনক আচরণ করে।
সোহাইব আবু কাবাশ বলেন, হামলাকারীরা তাদের পরিবারের শত শত ভেড়া নিয়ে যায়, যা ছিল পরিবারের প্রধান জীবিকার উৎস। হামলার সময় নারী ও শিশুদেরও ভয়ভীতি দেখানো হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা বাহিনীর সহায়তা অনেক দেরিতে পৌঁছায় এবং হামলাকারীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সদে তেইমান আটককেন্দ্র আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর সেখানে বন্দিদের ওপর নির্যাতন, চিকিৎসা বঞ্চনা এবং যৌন সহিংসতার নানা অভিযোগ সামনে আসে। কয়েকজন ইসরায়েলি সেনার বিরুদ্ধে এক ফিলিস্তিনি বন্দিকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগও উঠেছিল। তবে পরে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ সেই অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেয়।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, সমস্যাটি শুধু একটি কারাগার বা একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গ্রেপ্তার, জিজ্ঞাসাবাদ, সামরিক আটক, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং কারাগার—সব মিলিয়ে একটি বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মধ্যেই এসব অভিযোগের উৎপত্তি। ফলে দায় নির্ধারণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে ইসরায়েল এসব অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছে। ইসরায়েল প্রিজন সার্ভিস জানিয়েছে, তারা আইন অনুযায়ী এবং কঠোর তদারকির আওতায় কাজ করে। বন্দিদের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করেই তাদের কারাবন্দি রাখা হয় বলে দাবি করেছে সংস্থাটি।
যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়েখিয়েল লেইতারও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। তার মতে, কোনো অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ তদন্তকারী সংস্থার কাছে জমা দেওয়া উচিত এবং সেসব অভিযোগ আইনানুগভাবে পর্যালোচনা করা হবে।
তবে ফিলিস্তিনি মানবাধিকারকর্মী ও সাবেক বন্দিদের বক্তব্য ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। তাদের দাবি, বছরের পর বছর ধরে একই ধরনের অভিযোগ উঠলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কার্যকর তদন্ত বা বিচার হয়নি। ফলে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
পিএনএস/এমএইউ
ইসরায়েলে ফিলিস্তিনিদের ওপর হিংস্র কুকুর লেলিয়ে চলে বর্বরতা
13-06-2026 01:50PM

