যে পাঁচ বিপদ থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া উচিত

  21-06-2026 12:23PM

পিএনএস ডেস্ক: মানুষের জীবনে এমন কিছু নিয়ামত আছে, এগুলো যেমন সুখ-শান্তির কারণ হয়, তেমনি কিছু বিষয় এমনও আছে, যেগুলো দুনিয়াকে দুর্বিষহ করে তুলতে পারে। তাই মহানবী (সা.) আল্লাহর কাছে বিশেষ কিছু অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন।

তিনি দোয়া করতেন, ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই খারাপ প্রতিবেশী থেকে, এমন স্ত্রীর অনিষ্ট থেকে যে বার্ধক্য আসার আগেই আমাকে বৃদ্ধ করে দেয়, এমন সন্তানের অনিষ্ট থেকে যে আমার ওপর কর্তৃত্ব ফলাতে চায়, এমন সম্পদ থেকে যা আমার জন্য শাস্তির কারণ হয় এবং এমন ধূর্ত বন্ধুর অনিষ্ট থেকে, যে আমার ভালো দেখলে গোপন করে আর মন্দ দেখলে প্রচার করে।’ (তাবরানি)

এই দোয়ায় মানবজীবনের পাঁচটি বড় পরীক্ষার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নিম্নে বিষয়গুলো আরেকটু স্পষ্ট করে তুলে ধরা হলো;

খারাপ প্রতিবেশী

প্রতিবেশী মানুষের সবচেয়ে নিকটবর্তী লোকজন। যাদের সঙ্গে প্রতিদিন দেখা হয়, বিভিন্ন রকম সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হয়। কিন্তু প্রতিবেশী যদি খারাপ হয়, তা মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলতে পারে। তাই রাসুল (সা.) এমন প্রতিবেশী থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়েছেন।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ যাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হলো, প্রতিবেশী। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা ইবাদত কর আল্লাহর, তাঁর সঙ্গে কোনো কিছুকে শরীক করো না। আর সদ্ব্যবহার কর মা-বাবার সঙ্গে, নিকট আত্মীয়ের সঙ্গে, এতিম, মিসকিন, নিকট আত্মীয়- প্রতিবেশী, অনাত্মীয়- প্রতিবেশী, পার্শ্ববর্তী সাথী, মুসাফির এবং তোমাদের মালিকানাভুক্ত দাস-দাসীদের সঙ্গে। নিশ্চয় আল্লাহ পছন্দ করেন না তাদেরকে যারা দাম্ভিক, অহঙ্কারী।’ (সুরা নিসা, আয়াত ৩৬)

প্রতিবেশীর সঙ্গে সদ্ব্যবহার করাও ঈমানের অন্যতম অঙ্গ। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর শপথ! সে ব্যক্তি মুমিন নয়। আল্লাহর শপথ! সে ব্যক্তি মুমিন নয়। আল্লাহর শপথ! সে ব্যক্তি মুমিন নয়। জিজ্ঞেস করা হলো: হে আল্লাহর রাসুল! কে সে লোক? তিনি বললেন, যে লোকের প্রতিবেশী তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকে না।’ (বুখারি, হাদিস : ৬০১৬)

তাই খারাপ প্রতিবেশী থেকে যেমন আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে হবে, তেমনি নিজেকেও একজন কল্যাণকামী প্রতিবেশী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

কষ্টদায়ক জীবনসঙ্গী

স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক হতে ভালোবাসা, দয়া ও প্রশান্তির ভিত্তিতে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে সে কওমের জন্য, যারা চিন্তা করে।’ (সুরা রুম, আয়াত : ২১)

কিন্তু জীবনসঙ্গী যদি নির্যাতন, অশান্তি ও মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সংসারের সুখ নষ্ট হয়ে যায়। তাই নিজেকে এমন জীবনসঙ্গী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে যেন, সংসারে সুখ-শান্তি অটুট থাকে, তেমনি যে ধরনের সঙ্গীর কারণে পরিবারে অশান্তি তৈরি হয়, সে ধরনের সঙ্গী থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে হবে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৮৯৫)

অবাধ্য ও সীমালঙ্ঘনকারী সন্তান

সন্তান আল্লাহর বড় নিয়ামত। কিন্তু সন্তান যদি অবাধ্য, জালেম বা অহংকারী হয়ে ওঠে, তবে তা মা-বাবার জন্য বড় পরীক্ষা। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,‘হে মুমিনগণ! তোমাদের স্বামী/ স্ত্রী ও সন্তানদের মধ্যে কেউ কেউ তোমাদের শত্রু। অতএব তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকো।’ (সুরা তাগাবুন, আয়াত : ১৪)

এর পরের আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো কেবল পরীক্ষামাত্র।’ (সুরা তাগাবুন, আয়াত : ১৫)
এ জন্যই রাসুল (সা.) সন্তানদের সুশিক্ষা ও উত্তম চরিত্র গঠনের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। কারণ অবাধ্য সন্তান দুনিয়া ও আখিরাত উভয় ক্ষেত্রেই বিপদের কারণ হতে পারে।

শাস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ানো সম্পদ

অর্থ-সম্পদ মহান আল্লাহর নিয়ামত। তবে মানুষের কর্মপদ্ধতি ও বদ আমলের কারণে তা বিপদজনক হয়ে ওঠে। যেমন, হারাম উপার্জন, কৃপণতা বা সম্পদের মোহ মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এ জন্য মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তানসন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন না করে।’ (সুরা মুনাফিকুন, আয়াত : ৯)

আল্লাহর নির্দেশিত পদ্ধতিতে হালাল ভাবে সম্পদের উপার্জন ও আল্লাহর পথে ব্যয় করার মাধ্যমে মানুষ তাদের দুনিয়া আখিরাতকে সাজাতে পারে। আবার সম্পদের মোহে পড়ে পাপাচারে লিপ্ত হয়ে গেলে এই সম্পদই মানুষের দুনিয়া-আখিরাতে লাঞ্ছনা ও কঠিন শাস্তির কারণ হতে পারে। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আর যারা স্বর্ণ-রৌপ্য জমা করে রাখে এবং আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দাও।’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ৩৪)

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক উম্মতের জন্য কোনো না কোনো ফিতনা আছে, আর আমার উম্মতের ফিতনা হলো সম্পদ।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৩৩৬)

ধূর্ত ও কপট বন্ধু

বন্ধু মানুষের চরিত্র ও জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। অসত্ বন্ধু মানুষের গোপন ত্রুটি খুঁজে বেড়ায়, ঈর্ষা করে, সম্ভাবনা নষ্ট করতে গোপনে ষড়যন্ত্র করে এবং বিপদে সহযোগিতা না করে দূরে সরে থাকে, সম্ভব হলে ক্ষতি করার চেষ্টা করে।

বন্ধুত্বের ভিত্তি যদি ঈমান ও আল্লাহর সন্তুষ্টি না হয়, তাহলে এরকম পরিস্থিতিতে পড়া স্বাভাবিক। আর যদি তার ভিত্তি হয়, ঈমান ও আল্লাহর সন্তুষ্টি, তাহলে কঠিন কিয়ামতের দিনও সেই বন্ধুত্ব অটুট থাকবে। এ ব্যাপারে সতর্ক করে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘সেদিন ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা পরস্পর শত্রু হয়ে যাবে, তবে মুত্তাকিরা ছাড়া।’ (সুরা যুখরুফ, আয়াত : ৬৭)
তাই বন্ধু নির্বাচনে সতর্ক থাকতে হবে। এমন বন্ধুদের থেকে দূরে থাকতে হবে, যারা দুনিয়া-আখিরাতে ক্ষতির কারণ হয়।

আবু মুসা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘সত্ সঙ্গী ও অসত্ সঙ্গীর দৃষ্টান্ত হলো, কস্তুরিওয়ালা ও কামারের হাঁপরের ন্যায়। কস্তুরিওয়ালা হয়তো তোমাকে কিছু দান করবে কিংবা তার কাছ থেকে তুমি কিছু খরিদ করবে কিংবা তার কাছে তুমি সুবাস পাবে। আর কামারের হাঁপর হয়তো তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে কিংবা তার কাছ থেকে পাবে দুর্গন্ধ।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৫৩৪)

উল্লিখিত পাঁচ বিষয় থেকে আশ্রয় চেয়ে রাসুল (সা.)-এর করা এই দোয়া আমাদের শেখায় যে মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় কষ্ট অনেক সময় বাইরের শত্রুর কারণে নয়; বরং নিকটবর্তী সম্পর্কগুলোর মাধ্যমে আসে। খারাপ প্রতিবেশী, অশান্তিকর জীবনসঙ্গী, অবাধ্য সন্তান, উদাসীনকারী সম্পদ এবং ধূর্ত বন্ধু—মানুষের জীবনকে তছনছ করে দিতে পারে। ঈমান-আমলকে নষ্ট করে দিতে পারে। তাই প্রতিটি মুমিনের উচিত, এসব বিষয় থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া এবং নিজের চরিত্র ঠিক করা। যাতে নিজের কারণে অন্যদের কষ্ট না হয়। মহান আল্লাহ সবাইকে তাওফিক দান করুন। আমিন।



পিএনএস/এমএইউ

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন