পিএনএস ডেস্ক: ডিফেন্ডিং বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা চলমান ২০২৬ বিশ্বকাপেও দারুণ ছন্দে আছে। তবে তাদের ম্যাচগুলোয় ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর প্রাণোচ্ছ্বল উপস্থিতি এবং খেলার রুদ্ধশ্বাস মুহূর্তে দুশ্চিন্তায় থাকার মতো মুখ ফসকে বলে ফেলা মন্তব্য বিতর্ক জন্ম দিয়েছে। এ ছাড়া মিশরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার শেষ ষোলোর ম্যাচে রেফারির একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়েও তৈরি হয়েছে প্রশ্ন। তাহলে বিশ্বকাপে কি আর্জেন্টিনা বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে– এমন প্রশ্নের উত্তরে কিছু পরিসংখ্যান হাজির করেছে সংবাদমাধ্যম বিবিসি।
শেষ ষোলোতে আর্জেন্টিনার কাছে ৩-২ গোলে হারের পর মিশরের কোচ হোসান হাসান ম্যাচ রেফারি ও ফিফার বিরুদ্ধে আঙুল তুলে বলেন, ‘ম্যাচে আমাদের সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে। আমরা অবিচারের শিকার হয়েছি। হয়তো তারা বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নকে টুর্নামেন্টে রাখতে চেয়েছে। তারা চেয়েছে (লিওনেল) মেসি যেন শিরোপার দৌড়ে টিকে থাকেন।’ এ ছাড়া রেফারির বিরুদ্ধে ফিক্সিংয়ের অভিযোগ তুলে বিশ্বকাপের বাকি অংশ থেকে সরিয়ে নেওয়ার আহ্বানে ফিফাকে চিঠি দেয় মিশর।
ফিফার চিফ রেফারিং অফিসার পিয়েরলুইজি কোলিনা ইতোমধ্যে রেফারির সিদ্ধান্তের সমর্থনে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, ফাউল মানেই ফাউল। সেটি যতই স্পষ্ট বা কম স্পষ্ট মনে হোক না কেন, রেফারি মাঠে ঘটনাটি দেখতে না পেলে ভিএআর হস্তক্ষেপ করতে পারে। আবার গোলের আগের ফাউল শনাক্ত না হলে সেটিও রেফারিকে জানিয়ে দেয় ভিএআর। প্রতিপক্ষের পায়ের ওপর পা রাখা ফাউল। কিন্তু কোনো ডিফেন্ডার যদি আগে বল স্পর্শ করেন এবং এরপর স্বাভাবিক ফুটবলীয় সংস্পর্শ ঘটে, তাহলে সেটিকে ফাউল ধরা হয় না। এই ম্যাচে দুটোই দেখা গেছে।
তুলনামূলক কম হলুদ কার্ড আর্জেন্টিনার
কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা ৮টি দলের মধ্যে ফাউলের অনুপাতে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন হলুদ কার্ড দেখেছেন আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা। পুরো বিশ্বকাপের হিসাবে এখন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ৯৬ ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনার চেয়ে ফাউল গড়ে কম হলুদ কার্ড পেয়েছে কেবল তিনটি দেশ– চেক প্রজাতন্ত্র, নরওয়ে এবং তিউনিসিয়া। এর মধ্যে নরওয়ে বাদে বাকি দুটি দেশই গ্রুপপর্ব থেকে বিদায় নিয়েছে।
প্রতি ১৯.৭ ফাউলের অনুপাতে একটি হলুদ কার্ড দেখেছে আর্জেন্টিনা। তাদের চেয়ে গড়ে কম হলুদ কার্ড পাওয়া তিন দেশ যথাক্রমে– চেক প্রজাতন্ত্র প্রতি ৩৭ ফাউলে ১টি, নরওয়ে প্রতি ২৪ ফাউলে ১টি এবং তিউনিসিয়া প্রতি ২৭ ফাউলে ১টি কার্ড।
কোয়ার্টারে ওঠা ৮ দলের হলুদ কার্ডের পরিসংখ্যান (অপ্টা)
দলফাউলসংখ্যহলুদ কার্ডফাউলপ্রতি কার্ড
নরওয়ে৪৮২২৪.০
আর্জেন্টিনা৫৯৩১৯.৭
স্পেন৫৫৩১৮.৩
বেলজিয়াম৬০৪ ১৫.০
ফ্রান্স ৪৯৪ ১২.৩
সুইজারল্যান্ড ৬৯৬ ১১.৫
মরক্কো৬১৬১০.২
ইংল্যান্ড ৫৪৭ ৭.৭
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠতে চাওয়া দলগুলোর মধ্যে কার্ডজনিত নিষেধাজ্ঞায় পড়ার সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে আছে ইংল্যান্ড ও মরক্কো। নকআউটে তাদের সমান ৪ জন খেলোয়াড় একটি করে হলুদ কার্ড দেখেছে। এ ছাড়া সুইজারল্যান্ড ও ফ্রান্সের ৩ জন করে এবং স্পেন, বেলজিয়াম, আর্জেন্টিনা ও নরওয়ের একজন করে হলুদ কার্ড দেখেন।
সর্বোচ্চ পেনাল্টি আর্জেন্টিনার
২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের পথে আর্জেন্টিনা এক আসরে সর্বোচ্চ পাঁচটি পেনাল্টি পেয়েছিল। যা এক আসরে কোনো দলের সর্বোচ্চ পেনাল্টি পাওয়ার রেকর্ড। ২০২৬ বিশ্বকাপেও এখন পর্যন্ত আর্জেন্টিনাই সর্বোচ্চ তিনটি পেনাল্টি পেয়েছে। এর মধ্যে যদিও অস্ট্রিয়া ও মিশরের বিপক্ষে দুটি পেনাল্টি মিস করেছেন লিওনেল মেসি।
এ ছাড়া চলতি আসরে ইংল্যান্ড ও সুইজারল্যান্ড দুটি করে পেনাল্টি পেয়েছে। আর বেলজিয়াম, ফ্রান্স ও নরওয়ে পেনাল্টি পেয়েছে একটি করে।
লাল কার্ড ও নিষেধাজ্ঞা এড়ান মেসি
টুর্নামেন্টের শুরুতে আলজেরিয়ার অধিনায়ক আইসা মান্দিকে বুটের তলা দিয়ে কড়া ট্যাকল করেছিলেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। যা ভিএআরে পর্যালোচনা হয়নি। এমনকি সেজন্য মেসিকে হলুদ কার্ডও দেখতে হয়নি বলে বেশ সমালোচনা হয়েছিল। অথচ গত সপ্তাহে একই ধরনের ট্যাকলের জন্য ভিএআর পর্যালোচনার পর যুক্তরাষ্ট্রের ফোলারিন বালোগুনকে লাল কার্ড দেখানো হয়েছিল।
দুটি ঘটনাতেই প্রতিপক্ষের পায়ের ওপরের অংশে আঘাত লেগেছিল। মেসি যদি ওই ম্যাচে লাল কার্ড পেতেন, তাহলে তিনি সর্বোচ্চ কয়েক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা পেতে পারতেন। ন্যূনতম এক ম্যাচ নিষিদ্ধ হলেও আলজেরিয়ার বিপক্ষে খেলা এবং জোড়া গোল পাওয়া হতো না তার। বর্তমানে সর্বোচ্চ ৮ গোল নিয়ে চলতি আসরের সর্বোচ্চ এবং বিশ্বকাপের ইতিহাসেও সর্বোচ্চ গোলদাতা (২১) মেসি।
ক্লাব বিশ্বকাপে মেসিকে খেলাতে ফিফার কৌশল
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো মেগা টুর্নামেন্টে মেসিকে রাখতে পছন্দ করেন বলে সর্বশেষ ২০২৫ ক্লাব বিশ্বকাপের সময় ছড়িয়ে পড়ে। গত বছরের যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত প্রথম ক্লাব বিশ্বকাপে স্বাগতিক দেশের কোন ক্লাব খেলবে, তা ঘোষণা করতে কিছুটা সময় নেয় ফিফা। ওই বছরের চ্যাম্পিয়ন দলই বিশ্বকাপে সুযোগ পাবে বলে স্বাভাবিকভাবে ধারণা ছিল। কিন্তু প্লে-অফ জিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়া এলএ গ্যালাক্সির পরিবর্তে ২০২৪ সালের এমএলএস সাপোর্টার্স শিল্ড জয়ী ইন্টার মায়ামিকে বেছে নেওয়া হয়। যাদের হয়ে মেসি ক্লাব বিশ্বকাপে খেলেছেন।
বিশ্বকাপের ড্রয়ে সুবিধা
গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের ড্রয়ে ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে ফিফা। সে অনুসারে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ চার দল– ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা, স্পেন ও ইংল্যান্ডকে আলাদা চারটি কোয়ার্টারে রাখা হয়। তারা সবাই যদি নিজেদের গ্রুপে জেতে, তাহলে সেমিফাইনালের আগে একে অপরের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ থাকবে না। ফলে ফ্রান্স ও স্পেন পড়েছে এক অংশে, আর আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড অন্য অংশে।
এর উদ্দেশ্য ছিল বড় দলগুলোর লড়াই যেন খুব তাড়াতাড়ি না হয়। তবে এর ফলে শীর্ষ দলগুলোর জন্য তুলনামূলক সহজ পথও তৈরি হয়েছে। প্রথম দুই নকআউট রাউন্ডে বিশ্বের শীর্ষ ১০ দলের মধ্যে মাত্র দুটি ম্যাচ হয়েছে– নেদারল্যান্ডস বনাম মরক্কো এবং স্পেন বনাম পর্তুগাল। সেই তুলনায় আর্জেন্টিনা তুলনামূলক সহজ পথ পেয়েছে। যদিও ৬৭তম র্যাঙ্কিংয়ের কেপ ভার্দে ও ২৯তম র্যাঙ্কিংয়ের মিশরের বিপক্ষে কষ্টসাধ্য জয় পায় আর্জেন্টিনা (সমান ৩-২ ব্যবধানে)।
কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ ১৯তম র্যাঙ্কিংয়ের সুইজারল্যান্ড। এ ছাড়া ইংল্যান্ডও সম্ভাব্য সেমিফাইনালের আগে শীর্ষ ১০ দলের কারও মুখোমুখি হবে না, তবে শেষ ষোলোতে তাদের ১৪তম র্যাঙ্কিংয়ের মেক্সিকোকে হারাতে হয়েছে। অন্যদিকে, স্পেন ইতোমধ্যে ৫ নম্বর র্যাঙ্কিংয়ের পর্তুগালকে হারিয়েছে এবং কোয়ার্টারে খেলবে ৯ নম্বর বেলজিয়ামের বিপক্ষে। একই রাউন্ডে ফ্রান্সের প্রতিপক্ষ ৭ নম্বর র্যাঙ্কিংয়ের মরক্কো।
ফ্রান্স–মরক্কো ম্যাচে পুরো রেফারি প্যানেল আর্জেন্টাইন
আজ (বৃহস্পতিবার) কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্স ও মরক্কোর ম্যাচে প্রথমবারের মতো পুরো অন-ফিল্ড অফিশিয়াল দল রেফারি, দুই সহকারী, চতুর্থ কর্মকর্তা এবং রিজার্ভ কর্মকর্তা সবাই আর্জেন্টাইন। প্রধান রেফারি ফাকুন্দো টেলো এর আগের দুটি ম্যাচে চতুর্থ রেফারি ও রিজার্ভ রেফারির দায়িত্বে ছিলেন। গতবারের রানার্সআপ ফ্রান্সের মতো দলের ম্যাচে সব আর্জেন্টাইন রেফারি হওয়ায় স্বভাবতই প্রশ্নের মুখে পড়েছে ফিফা।
পিএনএস/রাআ
সর্বোচ্চ পেনাল্টি, দ্বিতীয় সর্বনিম্ন কার্ড; আর্জেন্টিনা সুবিধা পাচ্ছে?
09-07-2026 02:56PM

