কক্সবাজারে প্রস্তুত ৬৪৮ আশ্রয়কেন্দ্র, চালু কন্ট্রোল রুম

  09-07-2026 09:58AM

পিএনএস ডেস্ক: টানা কয়েক দিনের ভারি বর্ষণে কক্সবাজারজুড়ে প্লাবন, জলমগ্নতা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। জেলার অধিকাংশ উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে, বিচ্ছিন্ন হয়েছে সড়ক যোগাযোগ, বন্ধ রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সব নৌপথ।

পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কায় জেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করে পাহাড়ের ঢালু, পাদদেশ এলাকা ও বন্যাকবলিত নিচু স্থানে বসবাসকারীদের অবিলম্বে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে মাইকিং করছে। ক্ষেত্র বিশেষে জোর করেই অনেককে নিরাপদে সরানো হচ্ছে। একই সঙ্গে দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে খোলা হয়েছে কন্ট্রোল রুম।

বুধবার (৮ জুলাই) বিকেলে জেলা প্রশাসনের জারি করা গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী কয়েক দিন ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। এ অবস্থায় যেকোনো ধরনের প্রাণহানি এড়াতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিকটস্থ সাইক্লোন শেল্টারে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

জরুরি প্রয়োজনে জেলা প্রশাসনের কন্ট্রোল রুমের ০১৮৭২-৬১৫১৩২ নম্বরে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান জানান, জেলার ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উদ্ধার, ত্রাণ ও জরুরি সহায়তা কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একটি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া কেটে না যাওয়া পর্যন্ত সবাইকে সতর্ক থাকার এবং সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বানও জানান তিনি।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের তথ্য অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে টানা বর্ষণে জেলার ১০টি উপজেলার অন্তত ৩৫টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। বন্যা, জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসে এখন পর্যন্ত ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্তত এক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কক্সবাজার সদর, উখিয়া, টেকনাফ, রামু, চকরিয়া, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, পেকুয়া ও ঈদগাঁও উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এখন দুর্যোগে বিপর্যস্ত।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, বুধবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত হয়েছে ১০৩ মিলিমিটার, মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ১২৯ মিলিমিটার, তার আগের ২৪ ঘণ্টায় ২৭৭ মিলিমিটার এবং আরও আগের ২৪ ঘণ্টায় ২৪০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়। চারদিনে মোট বৃষ্টিপাত হয়েছে ৭৪৯ মিলিমিটার, যা সাম্প্রতিক সময়ের সর্বোচ্চ।

তিনি বলেন, অল্প সময়ে এমন অতিভারি বৃষ্টিপাত পাহাড়ধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরে এখনো ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রয়েছে। ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাত অন্তত ১১ জুলাই পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। এতে আরও ২-৩ দিন ভোগান্তি থাকবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, অতি বৃষ্টির কারণে পাহাড়ের মাটি সম্পূর্ণ পানিসিক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে যেকোনো সময় নতুন করে বড় ধরনের পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটতে পারে। পাশাপাশি শহর ও গ্রামীণ এলাকার খাল-নালা উপচে পড়ায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।

জেলা প্রশাসনের তথ্য মতে, জেলার শত শত ঘরবাড়িতে পানি ঢুকেছে। তলিয়ে গেছে অসংখ্য গ্রামীণ সড়ক। বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিভিন্ন স্থানে ব্যাহত হয়েছে। কক্সবাজার শহরের কলাতলী, সুগন্ধা, হোটেল-মোটেল জোন, বাজারঘাটা, তারাবনিয়াছড়া, আলীরজাহাল ও বাস টার্মিনাল এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে গেছে। কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই শহরের অধিকাংশ সড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।

এদিকে উত্তাল সাগরের কারণে টানা ছয় দিন ধরে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌপথে যাত্রীবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে কক্সবাজার-মহেশখালী ও পেকুয়া-কুতুবদিয়া নৌপথেও নৌযান চলাচল বন্ধ থাকায় হাজারো মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।

রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। টানা বর্ষণে সেখানে দুই শতাধিক পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। ঝুঁকিতে রয়েছে পাহাড়ঘেঁষা অসংখ্য বাড়ি।

জেলা প্রশাসক বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য পর্যাপ্ত শুকনো খাবার মজুত রয়েছে। আরও শুকনো খাবারের চাহিদা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য ঢেউটিন প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে কন্ট্রোল রুমের কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে এবং সব উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালানো হবে।


পিএনএস/রাআ

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন